...|...|...

সারাদেশ

ভোলার উপকূলে প্রকৃতির জাদু, মুগ্ধতা ছড়ায় নদী-চর ও সবুজ বন

জি এম ছানাউল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৮:২৬
Shares
ভোলার উপকূলে প্রকৃতির জাদু, মুগ্ধতা ছড়ায় নদী-চর ও সবুজ বন

ভোলার উপকূলের প্রকৃতির। ছবি: টাইমস টুডে

সকালের নরম রোদ মেঘনার বুকে পড়তেই ঝিলমিল করে ওঠে নদীর জল। দূরে মাছ ধরার নৌকা, বাতাসে দুলতে থাকা পাল আর নদীর কিনারে জেগে ওঠা চরে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি। কোথাও সবুজ ম্যানগ্রোভ বন, কোথাও ঢেউয়ের অবিরাম গর্জন। দিগন্তজোড়া জলরাশি আর আকাশের মিতালিতে প্রকৃতি যেন এঁকেছে এক জীবন্ত ছবি। নদী, বন, চর আর মানুষের জীবনসংগ্রামে গড়ে ওঠা এমনই এক অনন্য জনপদ ভোলা।

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থিত দ্বীপজেলা ভোলার চারপাশে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি। নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, আঁকাবাঁকা খাল আর সবুজের সমারোহ এ জনপদকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল-প্রকৃতির এই দুই রূপ পাশাপাশি দেখা যায় ভোলার উপকূলে।

এখানে নদী কেবল জলধারা নয়, অসংখ্য মানুষের জীবিকার অবলম্বন। চর শুধু এক টুকরো ভূমি নয়, নতুন করে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। আর উপকূলীয় বন কেবল সবুজের সমারোহ নয়, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রকৃতির তৈরি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাবলয়।

চর কুকরি-মুকরি: সবুজ বনের বুকে প্রকৃতির মায়া

ভোলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা উঠলে প্রথমেই আসে চর কুকরি-মুকরির নাম। চরফ্যাশন উপজেলার এই উপকূলীয় জনপদে নদী, বন ও বালুচর মিলে তৈরি করেছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এখানে বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক আর নদীর ঢেউ যেন প্রকৃতির নিজস্ব সংগীত।

কেওড়া-গেওয়ার সবুজ বন, গাছের শ্বাসমূল আর বনের ফাঁক দিয়ে দেখা নদীর জল-প্রতিটি দৃশ্যেই রয়েছে আলাদা মুগ্ধতা। কোথাও বালুচর, কোথাও ঘন সবুজ, আবার কোথাও দিগন্তজোড়া জলরাশি। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য চর কুকরি-মুকরিকে দিয়েছে অনন্য পরিচিতি।

ভাটার সময় বালুচরে চোখ রাখলে দেখা মেলে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে একঝাঁক কাঁকড়া, আবার মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত গর্তে লুকিয়ে পড়ে। বালুর ওপর তাদের ফেলে যাওয়া অসংখ্য রেখা যেন প্রকৃতির আঁকা আলপনা। শীতকালে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির আনাগোনাও এ অঞ্চলের সৌন্দর্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।

চর কুকরি-মুকরির বনাঞ্চল বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সৌন্দর্য ধরে রাখতে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মনপুরা: নদীর ঢেউয়ে মিশে যায় গোধূলির রং

ভোলার আরেক প্রাকৃতিক আকর্ষণ মনপুরা দ্বীপ। এখানে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, নদীর চরে ঘুরে বেড়ানো মহিষের পাল আর দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া জলরেখা। দিনের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এলে নদীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে সূর্যাস্তের রঙিন আভা। আকাশের লালচে-কমলা রং আর নদীর জল মিলেমিশে তৈরি করে মায়াবী দৃশ্য।

মনপুরার সৌন্দর্য শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাও প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। নদীতে মাছ ধরা, নৌকায় যাতায়াত কিংবা চরের জমিতে জীবিকার সন্ধান-সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে দ্বীপজীবনের স্বতন্ত্র ছন্দ।

নদীর বুকে রঙিন নৌকা নিয়ে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য উপকূলের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা নৌকা আর দূরে উড়ে যাওয়া পাখির ঝাঁক ভোলার প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

তজুমদ্দিন ও চর নিজাম: নির্জনতারও আলাদা সৌন্দর্য

ভোলার তজুমদ্দিন ও চর নিজামসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাতেও ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির নানা রূপ। কোথাও নদীর বিস্তৃত জলরাশি, কোথাও নির্জন চর, আবার কোথাও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য। জনসমাগম থেকে দূরে এসব এলাকায় প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে।

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের জলরাশি দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, সময় যেন এখানে একটু ধীরগতিতে চলে। কিন্তু শান্ত এই দৃশ্যের আড়ালেই রয়েছে প্রকৃতির সাথে মানুষের প্রতিদিনের লড়াই। নদীর গতিপথ বদলায়, ভাঙে বসতভিটা, বিলীন হয় ফসলি জমি। আবার জেগে ওঠে নতুন চর, নতুন করে শুরু হয় জীবন।

সৌন্দর্যের আড়ালে দুর্যোগের সাথে লড়াই

ভোলার উপকূলের প্রকৃতি যেমন অপরূপ, তেমনি এখানকার মানুষের জীবনও নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটে অনেক পরিবারের। যে নদী জীবিকার জোগান দেয়, সেই নদীই কখনো কেড়ে নেয় বসতভিটা ও ফসলি জমি।

তবু থেমে থাকে না জীবন। ভোর হলেই জাল কাঁধে নদীর দিকে ছুটে যান জেলেরা। জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে ওঠে চরাঞ্চল। দুর্যোগের ক্ষত পেরিয়ে মানুষ আবার ঘর বাঁধে, নতুন করে স্বপ্ন দেখে। এই সংগ্রামী জীবনই ভোলার সৌন্দর্যকে দিয়েছে ভিন্ন এক গভীরতা।

উপকূলীয় বন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড থেকে এসব অঞ্চলকে রক্ষা করা জরুরি।

পর্যটনের সম্ভাবনা, প্রয়োজন প্রকৃতির সুরক্ষা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও নদীকেন্দ্রিক জীবনধারা-সব মিলিয়ে ভোলার উপকূলে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ অঞ্চলে পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। এ জন্য উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযাত্রা, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সাথে গুরুত্ব দিতে হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটনে। বনের ভেতরে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা, বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে অবকাঠামো নির্মাণের মতো কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলতে হবে। প্রকৃতিকে উপভোগ করার পাশাপাশি তা রক্ষার দায়িত্বও নিতে হবে সবাইকে।

ভোলা কেবল বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি দ্বীপজেলা নয়; এটি নদীর ঢেউয়ে লেখা জীবনের গল্প, সবুজ বনের নিঃশব্দ সৌন্দর্য আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ের এক জীবন্ত উপাখ্যান। এখানে প্রকৃতি কখনো মমতাময়ী, কখনো রুদ্র; কখনো শান্ত, কখনো দুরন্ত।

মেঘনার বুকে সূর্য ডুবে যায়, নদীর কিনারে জেগে ওঠে নতুন চর, আর পরদিন ভোরে আবার শুরু হয় মানুষের জীবনসংগ্রাম। চিরচেনা অথচ প্রতিদিন নতুন হয়ে ওঠা এই দৃশ্যপটই ভোলাকে করেছে অনন্য। প্রকৃতির এই সম্পদ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ভোলার উপকূল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক হয়েই থাকবে না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠবে এক অমূল্য প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার।