ইসরায়েলের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার যুগ শেষ হতে চলেছে বলে মন্তব্য করার পাশাপাশি ইসরায়েলের ব্যাংকিং খাত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে সক্ষম বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
সাংবাদিক রয় কাটজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু এসব মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে ডিজিটাল মুদ্রা ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলি সাংবাদিক ও বিশ্লেষক নাদাভ আয়ালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর এসব মন্তব্য দেশটির অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
মার্কিন সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এটা শেষ। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।’ তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলিদের নতুন বাস্তবতার সাথে অভ্যস্ত হতে হবে। কারণ, ‘আমেরিকা বদলে গেছে’।
বর্তমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে ইসরায়েলকে ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার সামরিক অনুদান এবং ৫০০ কোটি ডলার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ।
চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের এই সহায়তা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে নেতানিয়াহুর বক্তব্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বোঝা যায় না। বরং ভবিষ্যতে এই সহায়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা
নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, এমনকি ব্যাংকিং খাতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কোনো দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ, ঋণ, অর্থ পরিশোধ এবং সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ স্থানান্তরের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েলের ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সাথে লেনদেন সীমিত হয়ে পড়লে আমদানি-রফতানি, ব্যবসায়িক চুক্তি ও বিনিয়োগ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকা প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে ইসরায়েলের ব্যাংকিং খাতে সর্বাত্মক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে, এমন নয়। নেতানিয়াহু সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কথা বলেছেন।
বিকল্প হিসেবে ব্লকচেইন
সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনায় ডিজিটাল মুদ্রা ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির কথা বলেন নেতানিয়াহু। সাংবাদিক জানতে চান, ব্লকচেইন কি বিকল্প হতে পারে? জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, এটি সম্ভাব্য উপায়গুলোর একটি। এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
তবে পরিকল্পনাটির বিস্তারিত, এর বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া কিংবা কোন ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে, তা জানাননি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে কিছু লেনদেন করা সম্ভব হলেও এটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প নয়। আন্তর্জাতিক ঋণ, পুঁজিবাজার, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বড় পরিসরের বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালনায় প্রচলিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ব্লকচেইনে হওয়া অনেক লেনদেনের তথ্য শনাক্ত করা সম্ভব। ফলে ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করলেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ঝুঁকিতে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি
ইসরায়েলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি উচ্চপ্রযুক্তি খাত। ইসরায়েল ইনোভেশন অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির উচ্চপ্রযুক্তি খাত থেকে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য ও সেবা রপ্তানি হয়েছে। এটি দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৫৮ শতাংশ।
প্রযুক্তি, গবেষণা, সফটওয়্যার ও উন্নত সেবার ওপর নির্ভরশীল এই খাতের বিকাশে বিদেশি বাজার, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং নির্বিঘ্ন অর্থ লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে প্রযুক্তি খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, নতুন ব্যবসায়িক চুক্তি বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ও সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান ও রাশিয়ার মতো নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া দেশগুলো বিকল্প বাণিজ্যিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। তবে ইসরায়েলের অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন। দেশটির অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও বৈশ্বিক আর্থিক সংযোগের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
নেতানিয়াহুর বক্তব্য ঘিরে ইসরায়েলের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এর আগে নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে ‘সুপার স্পার্টা’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর ধারণা সামনে আসে। তবে এবার তিনি সম্ভাব্য ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছেন।
নাদাভ আয়ালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পেছনে দুটি সম্ভাবনা থাকতে পারে। প্রথমত, তিনি সত্যিই মনে করছেন ইসরায়েল এমন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে চাইছেন। দ্বিতীয়ত, যথাযথ প্রস্তুতি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়াই তিনি এমন একটি বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, যার অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা আর বাস্তবে তা কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। ইসরায়েলের অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত কতটা ঝুঁকিতে পড়বে, তা নির্ভর করবে দেশটির নীতিগত সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলে ইসরায়েল সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কতটা সামাল দিতে পারবে, নাকি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে দেশটির অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।



