...|...|...

বিশ্ব

রয়টার্সের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে হামের প্রকোপ না কমার ৩ কারণ জানাল ডব্লিউএইচও

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:২৯ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:২৭
Shares
বাংলাদেশে হামের প্রকোপ না কমার ৩ কারণ জানাল ডব্লিউএইচও

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, টিকাদানের হার হ্রাস এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি শিশুর কাছে সময়মতো পৌঁছাতে না পারার কারণে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, অন্যান্য দেশের জন্য এটি একটি বড় ধরনের বাস্তব সতর্কবার্তা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ছন্দপতন ঘটে। চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ২ হাজার মানুষের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে ২২ হাজার জনের শরীরে এই রোগ শনাক্ত হয়েছে। অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব সফলভাবে ঠেকাতে টিকাদানের হার অন্তত ৯৫ শতাংশ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ একসময় এই লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও, ২০২৫ সালে প্রথম ডোজ নেওয়ার হার ৯০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে, যা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গোষ্ঠীগত প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচিত ডব্লিউএইচওর নথিপত্র এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে যে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় লাখ লাখ শিশুর তথ্য বাদ পড়া, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং অভিভাবকদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে না পারার মতো সমস্যায় পড়েছিল বাংলাদেশ।

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর টিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, এটি প্রতিটি দেশের জন্য একটি বাস্তব সতর্কবার্তা। তিনি আরও জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া পদক্ষেপ একসময় প্রাদুর্ভাব থামিয়ে দিলেও ততক্ষণে বহু মানুষ আক্রান্ত হন এবং অনেকেই প্রাণ হারান। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, প্রাদুর্ভাব রোধে সরকার সম্ভাব্য সবকিছুই করছে। তবে অক্টোবর মাসে এই প্রতিবেদনের বিষয়ে পাঠানো অন্যান্য প্রশ্নের আর কোনো জবাব দেয়নি সরকার।

সিলেটের মর্মান্তিক চিত্র ও জরুরি কর্মসূচির ঘাটতি

দেশের ১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট অঞ্চলটি এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানকার প্রত্যন্ত এলাকায় দুই বছর বয়সি শিশু আরমান হোসেন গত জুলাইয়ে টিকা না নেওয়া অবস্থায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারটি তাদের তিন চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি বিক্রি করে দিয়েছিল। তার অপর টিকা না নেওয়া চার বছর বয়সি বোন অবশ্য বেঁচে গেছে। আরমানের বাবা ২৬ বছর বয়সী আমিন মিয়া জানান, সময়মতো টিকা দেওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মী তাঁদের গ্রামে আসেননি; তিনি বলেন, আমি ছেলেকে দাফন করার পরই কেবল তাঁরা এসেছিলেন।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি ১ হাজার হামের রোগীর মধ্যে দুজন থেকে তিনজনের মৃত্যু হয়। তবে অপুষ্টির মতো বিভিন্ন কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে এই রোগ আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

একই অঞ্চলের ছাতক শহরে কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদের ৯ মাস বয়সী মেয়ে লাবিবা আক্তারও গত জুনে টিকা না পেয়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। অথচ গত এপ্রিলে জরুরি কর্মসূচির আওতায় টিকাদানের বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছিল, ফলে তখন লাবিবা টিকা নিতে পারত। লাবিবার বাবা জানান, কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের জানাতে আসেননি।

এর আগে মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারওয়ার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন যে, জরুরি ড্রাইভের ফলে হটস্পটগুলোতে রোগীর সংখ্যা ‘প্রায় শূন্যের কোঠায়’ নেমে এসেছে এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অথচ এর পরেও গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন হাম রোগী শনাক্ত হয়, যা গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ। বিশ্বজুড়ে—বিশেষ করে মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ব্যক্তিদের নেতৃত্বাধীন সংশয়বাদিতার কারণে ধনী দেশগুলোতে যখন টিকা নিয়ে অনীহা বাড়ছে, তখন বাংলাদেশে টিকার সুবিধা ও সচেতনতার অভাবই প্রধান বাধা বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও টিকাদানের চিত্র

সম্প্রতি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ টিকাদানের ক্ষেত্রে একটি সাফল্যের নজির ছিল। ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রথম ডোজে ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে ৯৩ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু ওই বছরই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। সেই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘটে যান, টিকা অর্ডারে দেরি হয় এবং নিয়মিত কর্মসূচির সাথে থাকা ফলো-আপ টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

জুলাই মাসে প্রকাশিত ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে প্রথম ডোজ ৯০ শতাংশ ও দ্বিতীয় ডোজ ৮৬ শতাংশে নেমে আসার কথা জানানো হয়। এছাড়া প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সরকারি তথ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। সেখানে বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক হিসেবে টিকাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা লক্ষ্যমাত্রার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা ডোজ গণনায় ভুল বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

জরুরি কর্মসূচিতে লাখো শিশুর বাদ পড়া

হামের প্রাদুর্ভাবের পর বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও এবং এপ্রিলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর প্রথম দিকে সংক্রমণ কমলেও কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। জুনের আরেকটি স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে একই বয়সসীমার শিশুদের নিয়ে তৈরি করা লক্ষ্যমাত্রার তালিকায় হামের ক্যাম্পেইনের তুলনায় ৪০ লাখ বেশি শিশুর নাম পাওয়া যায়।

১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের উপদেষ্টা হায়দার রয়টার্সকে জানান যে, একটি ঘাটতি রয়েছে এবং অভিভাবকদের টিকায় অনীহা বা শিশুর অসুস্থতা এর জন্য দায়ী। এপ্রিল ও আগস্টে সরকার, ডব্লিউএইচও এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত অপ্রকাশিত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাড়া কিছু ঘাটতির জন্ম দিয়েছিল। সময়ের স্বল্পতার কারণে চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাই করেই কর্মসূচি শুরু করা হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রস্তুতি যাচাই ঠিকমতো না হলে সাধারণত সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরা টিকা থেকে বঞ্চিত হয় এবং এর মূল্য তাদেরই চুকাতে হয়।

হায়দার জানান চার সপ্তাহে ক্যাম্পেইন চালু হয়েছিল, তবে সাবেক টিকাদান প্রধান তাজুল ইসলাম আবদুল বারী বলেন, এর জন্য কয়েক মাসের পরিকল্পনা প্রয়োজন। আগস্টের বৈঠকে দেখা যায়, টিকা না নেওয়া নিশ্চিত রোগীর হার ক্যাম্পেইনের আগে ৮২ শতাংশ থেকে পরে ৮৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিদ্যমান ঘাটতিই স্পষ্ট করে।

ডব্লিউএইচওর উপ-প্রতিনিধি ড. রাজেশ নারওয়াল জানান, প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘাটতি এড়াতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে।

সিলেটে সরকারি হিসাব অনুযায়ী হামে ১৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে ১৬টি পরিবারের মধ্যে ৮টি পরিবার জানায় তারা কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখেনি, এবং অন্তত ৬টি পরিবার জানায় স্বাস্থ্যকর্মী এসেছে শিশু মারা যাওয়ার পর।

নতুন উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সরকার বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে নতুন একটি কর্মসূচি শুরু করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানান, কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে আমরা গ্রামের মানুষকে সম্পৃক্ত করব।

তবে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর জন্ম অনিবন্ধিত থেকে যায় এবং সরকারি তথ্য অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যকর্মীর পদ খালি রয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী হামের রোগীদের এক-তৃতীয়াংশই পাঁচ বছরের বেশি বয়সি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই বয়সীদেরও কর্মসূচির আওতায় আনার এবং ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের মাঝে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন। এছাড়া ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের দ্রুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের কারণ নিয়েও গবেষণা চলছে। সেপ্টেম্বর মাসে সিলেটের ১০০ শয্যার শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীর প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে পরিদর্শনের দিন ১৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।