গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিনকে বদলির আদেশ জারির এক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো পুরোনো কর্মস্থলেই বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার এমন অবস্থানকে ঘিরে স্থানীয় জনগণ, ভূমিসেবা গ্রহীতা, রাজনৈতিক মহল ও সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
দুই সাংবাদিককে হেনস্থা এবং অর্পিত সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিতর্কের পর তার বদলির আদেশ জারি হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তা কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার কারণ নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত ২৪ জুন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার উত্তম কুমার দাশ সই করা এক অফিস আদেশে জনস্বার্থে তাকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে বদলি করা হয়। আদেশে বদলি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ থাকলেও এক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি প্রথম নয়। এর আগেও গত ২০ এপ্রিল তাকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া গত ২৪ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পান। তবে তদবির ও লবিংয়ের মাধ্যমে আগের বদলির আদেশ স্থগিত করে সাদুল্লাপুরেই বহাল থাকেন বলে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এবারও একইভাবে বদলি কার্যকর না হওয়ায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে গত ১৮ জুন সরকারের অর্পিত সম্পত্তি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে যমুনা টেলিভিশনের সাংবাদিক জিল্লুর রহমান পলাশ ও সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক হেদায়েতুল ইসলাম বাবুর সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েন মো. জসিম উদ্দিন। পরে বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ২১ জুন গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে তদন্ত শেষে তাকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়। একই ঘটনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেসক্লাবগুলো বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানায়।
বদলির আদেশের পরও সাদুল্লাপুরে বহাল থাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন মহলে তদবির ও লবিংয়ের মাধ্যমে তিনি বদলির আদেশ কার্যকর হওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারি সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, 'যে কর্মকর্তার বদলির আদেশ হয়েছে, তার এখানে দায়িত্ব পালনের কথা নয়। আগেও বদলির আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি, এবারও একই অবস্থা। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি প্রভাবশালী মহল তার বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করছে বলে শুনছি। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।'
স্থানীয় সাংবাদিক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার কাছ থেকে আইন ও বিধি-বিধান মেনে চলার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু বদলির পরও কর্মস্থল না ছাড়ায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেন তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি, তা জনপ্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের খতিয়ে দেখা উচিত।'
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাদুল্লাপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কমরেড কামরুল ইসলাম বলেন, 'সাংবাদিকদের সাথে তার আচরণের বিষয়টি ভিডিও ফুটেজে সবাই দেখেছে। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানের পরই তার বদলির আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু এখনো সেই আদেশ কার্যকর হয়নি। এটি আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব, নাকি অন্য কোনো প্রশাসনিক কারণ—সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট করা উচিত।’
তিনি আরও জানান, শুনেছি তাকে এখনো জেলা প্রশাসন থেকে রিলিজ দেওয়া হয়নি। ভূমিসেবা গ্রহীতাদের হয়রানি ও অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত। তাকে ঘিরে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ রয়েছে। তাই বদলির আদেশ দ্রুত কার্যকর করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমিসেবা নিতে এসে অনেকেই হয়রানি ও অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। বদলির আদেশের পর থেকে তিনি অনিয়মিতভাবে অফিস করছেন এবং অধিকাংশ সময় অফিসের বাইরে থাকায় অনেক সেবাপ্রার্থী প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৩ জুলাই পর্যন্ত গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকেও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত (রিলিজ) করা হয়নি। অনেকের মতে, বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডের পরিপন্থী। ফলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা ছুটিতে থাকায় তার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, 'এসিল্যান্ডের বদলির আদেশ হয়েছিল, এটি সত্য। তবে নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখবে। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কেন এখনো রিলিজ দেওয়া হয়নি, সেটিও প্রশাসনিক বিষয়। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।'
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩৮তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার বাসিন্দা। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আ.লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলামসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে সমন্বয় করে হাট-বাজার ইজারা, খাদ্য ডিলার নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া খাসজমি, নামজারি, ভূমি প্রশাসন এবং সেবাপ্রার্থীদের সাথে আচরণ নিয়েও তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সাদুল্লাপুর উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়েও মো. জসিম উদ্দিনকে পাওয়া যায়নি। শনিবার দুপুরেও তার সরকারি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার বদলি ও নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, 'বারবার বদলির আদেশ হলেও তিনি কীভাবে একই কর্মস্থলে বহাল থাকছেন? কী এমন কারণে তিনি সাদুল্লাপুর ছাড়ছেন না?' স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ জনসম্মুখে তুলে ধরা হোক।
এদিকে, স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত বদলির আদেশ কার্যকর না হলে তারা মানববন্ধনসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। তাদের অভিযোগ, অসৌজন্যমূলক আচরণ, বদলির আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং দায়িত্ব পালন নিয়ে ওঠা নানা অভিযোগে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন মহলে জসিম উদ্দিনকে ঘিরে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
তাদের প্রত্যাশা, মো. জসিম উদ্দিন দ্রুত বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করবেন। একই সাথে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বদলির আদেশ কার্যকর করে নতুন সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিয়োগের মাধ্যমে ভূমিসেবায় স্বচ্ছতা, গতি ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাদুল্লাপুরবাসীর।


