ফরিদপুর শহরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে পথচারীদের আটকে কিংবা ঘিরে ধরে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বেদেপল্লীর কয়েকজন নারীর বিরুদ্ধে। আলিপুর মোড়, ১১ তলা ভবনসংলগ্ন এলাকা, জনতা ব্যাংক মোড় ও চকবাজারসহ ব্যস্ত সড়কের কয়েকটি স্থানে দিনের পর দিন এমন ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, গ্রামাঞ্চল থেকে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য শহরে আসা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে কয়েকজন নারী বিভিন্ন কৌশলে থামিয়ে টাকা দাবি করেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ঘিরে ধরা, পথ আটকে দাঁড়ানো, টানাহেঁচড়া এবং বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। পরিস্থিতি এড়াতে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে সেখান থেকে চলে যান বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, নারী ও দূর-দূরান্ত থেকে শহরে আসা সাধারণ মানুষ এসব পরিস্থিতিতে বেশি বিড়ম্বনায় পড়েন। অনেকেই প্রকাশ্যে অপমানিত বা হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কায় প্রতিবাদ না করে টাকা দিয়ে চলে যান। তবে টাকা না দিলে ছাড়তে চায় না ওরা।
ফরিদপুর সদর উপজেলার একটি গ্রাম থেকে অন্যদিনের মতোই প্রয়োজনীয় কাজে শহরে আসা ফাহিম শেখ অভিযোগ করে বলেন, তিনি শহরে আসার পর কয়েকজন নারী তাকে ঘিরে টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হয়েছে। এতে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার টাকা নিয়েও তাকে চিন্তায় পড়তে হয়।
আরেক ভুক্তভোগী সদর উপজেলার মমিন খারহাট এলাকার রুস্তম ব্যাপারীও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তার দাবি, শহরে জরুরি কাজে এসে তাকে ঘিরে টাকা চাওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত টাকা দিতে বাধ্য হন তিনি।
শহরের আলিপুর এলাকার বাসিন্দা রাহুল শেখ বলেন, তাকেও টানাহেঁচড়া করে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রাহুল শেখ বলেন, একদিকে তারা নারী, অন্যদিকে বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘটায় লজ্জা-শরমের কারণে অনেকে প্রতিবাদ করতে পারেন না। পুরুষ মানুষকে এভাবে টানাহেঁচড়া করলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই টাকা দিতে হয়।
এদিকে শহরের মুন্সিবাজারের অভিযুক্ত বেদেপল্লী নারীদের বক্তব্য জানতে চাইলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, আমরা পেটের দায়ে মানুষের কাছে টাকা চাই। আমাদের জীবিকার কষ্টটা আমাদের মতো শ্রেণির মানুষই জানে। কাজের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে শহরে এসে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিতে হয়।
তারা আরও বলেন, কাউকে হয়রানি করা বা জোর করে টাকা নেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে সংসার চালানো, সন্তানদের খরচ ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে আমাদের এভাবে মানুষের কাছে যেতে হয়। প্রশাসন যদি আমাদের বিকল্প কাজ বা সহায়তার ব্যবস্থা করে, তাহলে রাস্তায় এসে টাকা আর চাইতে হবে না।
তবে এ ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশের সামনেই জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখছেন স্থানীয়রা। শহরের আলিপুর এলাকার ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (টিএসআই) শেখ তুহিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ক্যামেরার সামনে আসেননি। তবে তিনি জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা তার নজরে আসে প্রতিদিনই।
টিএসআই শেখ তুহিন বলেন, সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় হলো, সাধারণ মানুষকে যেভাবে টেনে-হিঁচড়ে আমাদের সামনেই টাকা আদায় করা হয়, বিষয়টি আমি নিজেও কয়েকবার তাদের নিষেধ করেছি। কিন্তু নিষেধ করার পরও তারা আবার এসে মানুষের কাছ থেকে প্রকাশ্যে টাকা আদায় করে।
তিনি আরও বলেন, আমরা নিষেধ করতে গেলে তারা অনেক সময় আমাদের মা-বোন তুলে খুব খারাপ ভাষায় গালাগাল করে। তাদের ভাষা অত্যন্ত খারাপ। এ কারণে অনেক সময় আর নিষেধ করতে যাওয়া হয় না।
ট্রাফিক পুলিশের এই বক্তব্য থেকেই প্রশ্ন উঠছে, পথচারীদের প্রকাশ্যে আটকে টাকা আদায়ের অভিযোগ যদি দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সামনেই ঘটে থাকে, তাহলে স্থায়ীভাবে কেন এর সমাধান হচ্ছে না?
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে সাধারণ পথচারীকে হয়রানি, পথ আটকে টাকা আদায় কিংবা জোরপূর্বক অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও বন্ধ করা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্টদের পুনর্বাসন বা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে এ ধরনের পরিস্থিতি কমতে পারে। পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগী নাজমিন আক্তার বলেন, শহরে প্রয়োজনীয় কাজে এসেছিলাম। রাস্তার পাশে কয়েকজন আমাকে ঘিরে টাকা চাইতে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত টাকা দিয়ে সেখান থেকে চলে আসতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, তার মতো আরও অনেকে একই ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি দাবি করেন।
বিষয়টি নিয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া বলেন, এই ধরনের ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তাহলে এটি দুঃখজনক বিষয়।
তিনি জানান, শহরের মুন্সিবাজার এলাকায় বেদে সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। তাদের সরকারি কোনো আর্থিক বা অন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয় কি না, সে বিষয়টি খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি তাদের আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন হলে জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ করার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এখন পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে আমি জানতে পারিনি। তবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আমাদের টহল টিম নিয়মিত কাজ করছে। যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে শহরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে পথচারীদের কাছ থেকে এভাবে টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
শহরের ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে পথচারীদের আটকে টাকা দাবি বা হয়রানির অভিযোগ দিনের পর দিন চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব কোথায়?
তবে একইসাথে বেদে সম্প্রদায়ের জীবিকা ও মানবিক প্রয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার দাবি রয়েছে স্থানীয়দের। তাদের মতে, কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহের সংকট থাকলে তার সমাধান হওয়া প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক উদ্যোগে; সাধারণ পথচারীকে হয়রানি করে নয়।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ বা পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হোক।
ফরিদপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও ব্যস্ততম সড়কগুলোতে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।



