আপনি নিজে হয়তো ধোঁয়া ছুঁয়েও দেখেন না। রেস্তোরাঁ কিংবা পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত জায়গাগুলো এড়িয়ে চলেন, নিজের ঘরেও ধূমপান করা শক্তভাবে নিষেধ। কিন্তু কাজের ফাঁকে চায়ের দোকানের আড্ডায়, বারান্দায় কিংবা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় যখন পাশের কেউ হঠাৎ একটি সিগারেট ধরায়-তখন কী ঘটছে ভেবে দেখেছেন?
নাকের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া ওই ধোঁয়ার গন্ধটি কিন্তু কোনো সাধারণ বায়ু নয়। এটি মূলত পরোক্ষ ধূমপান বা ‘সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোক’-যা সিগারেট থেকে সরাসরি নির্গত ধোঁয়া ও ধূমপায়ীর প্রশ্বাসের এক প্রাণঘাতী মিশ্রণ।
ভারতে ক্যানসার চিকিৎসার দুই বিশেষজ্ঞ-ডা. অশ্বিন রাজভোজ (এমওসি ক্যানসার কেয়ার) এবং ডা. সেবন্তী লিমায় (স্যার এইচ এন রিল্যায়েন্স ফাউন্ডেশন হাসপাতাল)-পরোক্ষ ধূমপান কীভাবে নীরবে আমাদের শ্বাসযন্ত্র ও ফুসফুসকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তা তুলে ধরেছেন।
ফুসফুসের ওপর পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব
ডা. রাজভোজ উল্লেখ করেন, নিজে ধূমপান না করায় অধিকাংশ মানুষ পরোক্ষ ধোঁয়াকে একেবারেই গুরুত্ব দেন না। অথচ মানবদেহের ফুসফুস ও রক্তনালী প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ ধোঁয়ার মধ্যে কোনো তফাৎ করতে পারে না। সিগারেটের ক্ষতিকর ধোঁয়ায় প্রায় ৭ হাজারের বেশি বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান লুকিয়ে রয়েছে, যার অন্তত ৭০টি উপাদান ক্যানসার সৃষ্টির জন্য সরাসরি দায়ী।
ধূমপান না করেও বারবার এই বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এমনকি স্বল্প সময়ের ধোঁয়ার মুখোমুখি হওয়াও রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং শ্বাসনালীতে তীব্র প্রাক-প্রদাহ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ডা. লিমায়ে বলেন, সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোক কেবল দুর্গন্ধ নয়, এটি বিষাক্ত ক্যানসার-সৃষ্টিকারী ককটেল। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো-পরোক্ষ ধূমপানের কোনো নিরাপদ সীমা বা 'সেফ লেভেল' নেই। বাতাসে সামান্যতম ধোঁয়া থাকলেও তা ফুসফুস ও রক্ত সংবহনতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে সক্ষম।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন যারা
ডা. লিমায়ে সতর্ক করে জানান, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তামাকের পরোক্ষ ধোঁয়ায় সর্বাধিক ক্ষতির শিকার হন তিনটি বিশেষ দল:
শিশু: শিশুদের ফুসফুস পরিপূর্ণ বিকশিত হতে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ছোটবেলাতেই ঘন ঘন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও অ্যাজমা দেখা দেয়।
গর্ভবতী নারী: ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।
হৃদরোগ ও ফুসফুসের পূর্বরোগী: ধোঁয়ার সামান্য সংস্পর্শও অ্যাজমা বা হৃৎপিণ্ডের সমস্যা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
বাচার উপায় ও প্রতিরোধ
বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ পেলে ভয় না পেয়ে সতর্ক হওয়াই বুদ্ধিমত্তা। খোলা জানালা, ঘরে ফ্যান চালানো কিংবা এক কোণে দাঁড়িয়ে ধূমপান করলেও কিন্তু ধোঁয়া ঘরের অন্যান্য বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। তাই:
নিজের বাসভবন ও ব্যবহৃত গাড়িকে পুরোপুরি ধূমপানমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করুন।
প্রকাশ্য জায়গায় ধূমপানরত ব্যক্তিদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।
মনে রাখবেন, অন্য কারো তামাক গ্রহণের এই বিষাক্ত মাশুল আপনার সুস্থ ফুসফুস কেন দেবে?
পরোক্ষ ধূমপান কেবল অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভ্যাস বা পছন্দ নয়; এটি একটি বড় ধরনের পরিবেশগত ও সামাজিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। ক্যানসার প্রতিরোধের মূল কথাই হলো ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদানের সং স্পর্শ থেকে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে দূরে রাখা।


