সরকারি নিরীক্ষায় আপত্তি, মন্ত্রণালয়ের একের পর এক তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, পদোন্নতি কমিটির সদস্যদের অসম্মতি, দুদকের অভিযানে প্রাথমিক সত্যতার প্রমাণ, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণিত শ্বেতপত্রে প্রকাশিত অনিয়মের সাক্ষ্য ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর ব্যবস্থা গ্রহণের একাধিক তাগিদপত্র দেওয়া সত্ত্বেও অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তৎপরতা থেমে নেই। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে নতুন করে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে কমিশন।
সূত্রমতে, যে নিরীক্ষার আপত্তিতে কর্মকর্তাদের নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি ধরা পড়েছে সেগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে মর্মে অর্ধসত্য তথ্য প্রদানের মাধ্যমে জনপ্রশাসনের সচিবকে বিভ্রান্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে কমিশন। পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়োগ সম্পর্কিত প্রশাসনিক নিরীক্ষার আপত্তির সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে চাকুরি বিধির আলোকে মতামত চাওয়া হয়েছে। এজন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে মাধ্যমে চিঠি গত ১৫অক্টোবর চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি।
জানতে চাইলে বিটিআরসির মিডিয়া কমিউনিকেশন এন্ড পাবলিকেশন উইংয়ের উপপরিচালক মোঃ আব্দুস শাহীদ চৌধুরী টাইমস টুডেকে বলেন, বিটিআরসি থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে এরকম একটি চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।
চিঠি থেকে জানা গেছে, মোট তিনটি গুরুতর আপত্তির অধীনে যে কর্মকর্তাগণের নিয়োগে অনিয়মের জন্য অভিযুক্ত তাদের মধ্যে আট জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া যাবে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে এদের নাম উল্লেখ করা না হলেও, উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তারা হলেন সাবিনা ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন, রাইসুল ইসলাম এবং শামসুজ্জোহা। সিনিয়র সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক পদে মাহমুদুর রহমান, সহকারী পরিচালক থেকে সিনিয়র সহকারী পরিচালক পদে কাউছার আহমেদ, শামসুল আলম ও উপসহকারী পরিচালক থেকে সহকারী পরিচালক দেওয়ান মোঃ ফারুক আহমেদ রয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদের মধ্যে অনেকের বয়স, সার্টিফিকেটেরও সমস্যা রয়েছে এবং একজন পরবর্তীতে স্নাতকোত্তর শেষ করার সার্টিফিকেট জমা প্রদান সাপেক্ষে চাকরি স্থায়ী করা হবে মর্মে অবৈধভাবে চাকরি প্রদান করা হয়েছে যা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নজিরবিহীন। এই সংক্রান্ত দুটি অডিট আপত্তি- বিধি বহির্ভূত বয়স প্রমার্জন এবং বিধি উপেক্ষা করে নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান- ইতিমধ্যেই উত্থাপিত হয়েছে।
নিরীক্ষার আপত্তি থেকে জানা গেছে, নিয়োগ বিধি উপেক্ষা করে ২৯জন জুনিয়র পরাপর্শককে বিভন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে বিটিআরসিতে কর্মকরত রয়েছে খালেদ ফয়সাল রহমান, নাহিদুল হাসান, শারমিন সুলতানা, মাহমুদুর রহমান, মিরাজুল ইসলাম, এস এম তাইফুর রহমান, রাইসুল ইসলাম, তৌহিদুর নাহার, মাহরীন আহসান, সামিরা তাবাসসুম, এস এম গোলাম সারোয়ার, মেহফুজ বিন খালেদ, শামসুজ্জোহা, কাউছার আহমেদ ও শামসুল আলম। অবৈধভাবে নিয়োগকৃত এই কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে শামসুজ্জোহা, রাইসুল , মাহমুদুর রহমান, কাউছার আহমেদ ও শামসুলকে পদোন্নতি দিতে পাঁয়তারা করছে কমিশন। কমিশনের দেওয়া চিঠিতেও প্রমাণ রয়েছে যে, এই আপত্তির নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। বরং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অধীনস্ত ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, তথ্য এবং প্রচুক্তি অডিট অধিদপ্তর যে আবারও প্রমাণক চেয়েছে তার উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে, চিঠিতে উল্লিখিত বয়স প্রমার্জনের মাধ্যমে চাকরিতে ৩০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য থেকেও তিন জনকে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিটিআরসি। এদের মধ্যে রয়েছে দেলোয়ার হোসেন, কাউছার আহমেদ ও দেওয়ান ফারুক। এই আপত্তিও নিষ্পত্তি না হলেও নিয়মিত করণের শর্তে আপত্তিটি নিষ্পতি হিসেবে গণ্য করা হবে অডিট অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়। কিন্তু ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের মাধ্যমে নিয়মিত করণের উদ্যোগ এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়নি ফলে অডিট অধিদপ্তর থেকে এখনো নিষ্পত্তির সবুজ সংকেত মেলেনি বরং বয়স প্রমার্জনের বিস্তারিত শিডিউল চেয়েছে।
একই সঙ্গে বিধি বহির্ভূতভাবে স্ট্রেংদেনিং দ্যা রেগুলেটরি ক্যাপাসিটি অব বিটিআরসি প্রকল্পের অধীনে ২১জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে বিষয়েও অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে মর্মে চিঠিতে জনপ্রশাসন সচিবকে জানানো হলেও ভূতাপেক্ষ অনুমোদন বিটিআরসির পক্ষ থেকে দেওয়া হয় নাই। এই তালিকার অন্তর্ভূক্ত সাবিনা ইসলাম পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছে।
বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মেহেদী-উল-সহিদ সাক্ষরিত চিঠিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে অডিট আপত্তি কোনো বাঁধা নয় এমন বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করতে পদোন্নতি কমিটির কর্মকর্তাদের বক্তব্য, আইনজ্ঞের মন্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা পদোন্নতির যোগ্য হবে না মর্মে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে বলা হয়েছে, ‘উপস্থিত কর্মকর্তাগণের মধ্যে যেসকল কর্মকর্তার নিয়োগ সংক্রান্ত অডিট আপত্তি আছে, যেহেতু এই অডিট নিয়োগ সংক্রান্ত এবং যেহেতু তা এসএফআই, তাই বর্ণিত নিয়ো এবং আর্থিক বিষয়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।’
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ অবৈধ এবং তাদের চাকরিচ্যুত করে আপত্তিকৃত পরিশোধিত সকল বেতন-ভাতাদি আদায় করে কমিশনের তহবিলে জমা করার নির্দেশনাও দেওয়া হয় অডিট অধিদফতরের পক্ষ থেকে। ২০২৩ সালে অধিদফতরের উপপরিচালক ফিরোজ আহমেদ বিটিআরসিকে এক চিঠিতে এই নির্দেশনা প্রদান করে কিন্তু বিটিআরসি এসবের কিছুই প্রতিপালন করেনি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান টাইমস টুডেকে বলেন, নিয়োগ অবৈধ অথবা আইনানুগ না হলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের চাকরিচ্যুতি হবে পদোন্নতি নয়। সরকারি নিরীক্ষায় আপত্তি নিষ্পত্তির সূযোগ আছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ মন্ত্রণালয়ের কাজ। দুদকের অভিযানের পর মামলা না হয়ে থাকলে কেন মামলা হয়নি তা জানা দরকার। সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারির ব্যবস্থা গ্রহনের একাধিকবার আদেশ প্রতিপালন না হওয়া সরকারের দূর্বলতা তুলে ধরে। সম্ভবত আলোচিত কর্মকর্তারা বেশ শক্তিধর।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, ২০২০ সালে পরিচালিত নিরীক্ষায় বিভিন্ন পদে নিয়োগ এবং পদোন্নতিতে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। দুদকের অভিযান, একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত টেলিযোগাযোগ খাতের শ্বেতপত্র কমিটিও এ নিয়োগগুলোকে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নিয়োগ ও পদোন্নতির ওপর পরিচালিত নিরীক্ষায় ধরা পড়া অনিয়মের ওপর ২০২১ সালে প্রথম তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং তাতেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে আরও দুটি কমিটি গঠন করা হয়, সেই তদন্তেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন বিটিআরসিতে অভিযান চালিয়ে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের প্রমাণ পায়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং বারবার পুরস্কৃত করে আসছে।
আরও জানা যায়, বিভিন্ন তদন্তে জুনিয়র পরামর্শকদের রাজস্ব খাতে, বয়স শিথিলতার অপব্যবহার এবং প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিলেও সেটি উপেক্ষিত হয়। পরে ১০ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে নির্দেশনায় বলা হয়, যাদের বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এসবের পরও বিটিআরসি ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি বর্তমান সরকারের সময়ে দুর্নীতর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের কারও কারও পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করে যা বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটিতে আটকে যায়।
এমনকি চলতি বছরের মার্চ মাসে উচ্চ আদালত রুল জারি করে বলে বিটিআরসিতে ২৯ জনের অবৈধভাবে নিয়োগের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, একই সাথে তাদের পদোন্নতির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত কেন বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তাও জানতে চায়। এতদসত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নতুন কৌশলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করে পুরস্কৃত করে বিটিআরসি। চলতি মাসের কমিশন সভায় অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ২০জন সহ ৩৮জন কর্মকর্তার বেতন বৃদ্ধি করে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
সার্বিক বিষয়গুলো অবহিত করে মন্তব্য জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (টেলিকম) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ টাইমস টুডেকে বলেন, বিটিআরসি থেকে কোনো চিঠি পাঠিয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই।

