...|...|...

ধর্ম

তরুণদের আদর্শ জীবন গঠনে মহানবী (সা.)-এর ৫ নির্দেশনা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮:৫৩
Shares
তরুণদের আদর্শ জীবন গঠনে মহানবী (সা.)-এর ৫ নির্দেশনা

ছবি: সংগৃহীত

তরুণ বয়স মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। এ সময়ের চিন্তা, চরিত্র, অভ্যাস ও মূল্যবোধই ভবিষ্যৎ জীবনকে অনেকাংশে নির্ধারণ করে। তাই তরুণদের শক্তি ও মেধাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ-সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামেও তারুণ্যের সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তরুণদের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম, নৈতিকতা ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিয়েছেন। তার জীবন ও নির্দেশনায় রয়েছে আদর্শ জীবন গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা, যা আজকের তরুণদের জন্যও হতে পারে অনুসরণীয়।

১. সামাজিক সংহতি গড়ে তোলা

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একটি হাদিসে বলেছেন, যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।(তিরমিজি)

সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ এই হাদিসে মহানবী (সা.) তরুণ ও বয়স্ক-এই দুই প্রজন্মের মধ্যে একটি আদর্শ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মহানবী (সা.) বুঝিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ মুমিনের মধ্যে এই দুটি গুণ থাকা উচিত। এগুলো না থাকলেও ব্যক্তি মুমিন থাকেন, তবে আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা কমে যায়। মুমিন ছোটদের প্রতি দয়া দেখায়। তাদের ভালোবাসা, মনোযোগ, আস্থা ও ক্ষমা দিয়ে পাশে থাকে। অন্যভাবে বললে, এগুলো এমন কিছু গুণ, যা পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে তরুণদের ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভালোবাসা ও যত্নই এমন সম্পর্ক তৈরি করে, যা পরামর্শদানের উদ্দেশ্যকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নেয়।

সক্ষম তরুণদের ওপর আস্থা রাখা তাদের ক্ষমতায়নের অন্যতম কার্যকর উপায়। মহানবী (সা.) তরুণ সাহাবিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়ে তাদের ওপর আস্থা রাখতেন। এর একটি দৃষ্টান্ত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। 
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী (সা.) তাকে ইয়াসরিবের ছোট মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তিনি তাদের ইসলামের শিক্ষা দেন ও পথ দেখান। তার সফল দাওয়াত ও দিকনির্দেশনার ফলে অনেক মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। একপর্যায়ে এর পথ ধরেই ইয়াসরিব পরবর্তী সময়ে মদিনা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

তরুণদের ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়ায় ভুল-ত্রুটি হতেই পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু এটুকু বলা যে, ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই-এমন ক্ষমাশীল আচরণ তরুণদের মধ্যে আশা ও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে পারে। তরুণদের প্রতি এ ধরনের দয়াশীল আচরণ তাদের মধ্যে বড়দের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

এটি তরুণ ও বয়স্ক দুই প্রজন্মের পারস্পরিক দায়িত্ব। ওপরের হাদিসের আলোকে তরুণদেরও নিজেদের মধ্যে বয়স্কদের প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হবে। এতে তারা বিনয় ও মর্যাদার সাথে বয়সের পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে।

২. তরুণদের উদ্যম ও বয়স্কদের প্রজ্ঞা

নিঃসন্দেহে তারুণ্য এমন একটি সময়, যখন বিভিন্ন কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার শক্তি ও উদ্যম সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়ের ব্যাপক আগ্রহ ও আত্মনিয়োগ যেমন ইতিবাচক, তেমনি এটি সংগ্রাম ও জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজার সময়ও।

বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের এই সময়ে তরুণরা পরিচয়, সংস্কৃতি ও ধর্মসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনেক সময় একাধিক এবং দ্রুত সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। একই সাথে নিজেদের ভেতরের শূন্যতা পূরণ ও বিকশিত আবেগকে সঠিক পথে পরিচালনার মাধ্যম হিসেবেও তারা এসবের দিকে ঝোঁকে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কেউ কেউ উগ্রপন্থী তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা বিভিন্ন উৎসের ফাঁদে পড়ে। বিভিন্ন ঘটনাভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে তরুণ বয়সের শুরুর দিকের মানুষদের লক্ষ্য করে। তারা এমন সব বার্তা ছড়ায়, যা তাদের আবেগ ও সহানুভূতিকে উসকে দেয় এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।

তরুণদের উদ্যম যদি ভুল পথে পরিচালিত হয়, তাহলে তার অনেকটাই অপচয় হয়ে যায়। তাই এই শক্তির সাথে প্রজ্ঞার সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। আর প্রজ্ঞার মধ্যে সংযম, শৃঙ্খলা ও সমালোচনামূলক চিন্তার মতো মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত। ন্যায়বিচারের আহ্বান জানানো হলেই সেটি যে প্রকৃত ন্যায়বিচার হবে, এমন নয়। কোনো অসন্তোষ দূর করা বা নিছক প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজকে ন্যায়বিচার বলা যায় না।

ন্যায়বিচার হলো কোনো বিষয়কে তার যথাযথ জায়গায় স্থাপন করা। আর কোনো বিষয়কে যথাযথ জায়গায় কীভাবে স্থাপন করতে হয়, সেটিই প্রজ্ঞা। তাই তরুণদের জন্য জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এমন বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছ থেকে জ্ঞান নেওয়া প্রয়োজন, যাদের কাছে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা উভয়ই রয়েছে এবং যারা প্রজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ দেখাতে পারেন।

৩. সময়ের মূল্য

নিজের পাওয়া নিয়ামতগুলো গুনে দেখুন। তাহলে আল্লাহর রহমতে আপনি কতটা সমৃদ্ধ, তা উপলব্ধি করে বিস্মিত হবেন। শক্তি, উদ্যম ও সময় সবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। নিঃসন্দেহে কৃতজ্ঞ মানুষ মূল্যবান উপহারকে নষ্ট করে না। তাই আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে প্রশংসা ও আনুগত্যের মাধ্যমে এসব নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব।

একটি হাদিসে মহানবী (সা.) এসব নিয়ামত ইবাদত ও আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পাঁচটি জিনিসের আগে পাঁচটি জিনিসকে মূল্য দাও-বার্ধক্যের আগে তোমার যৌবনকে, অসুস্থতার আগে তোমার সুস্থতাকে, দারিদ্র্যের আগে তোমার সম্পদকে, ব্যস্ততার আগে অবসর সময়কে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে। (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)

তরুণদের উচিত জীবনের সোনালি সময় নষ্ট না করে জ্ঞান অর্জন, সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় সংগ্রামে নিজেদের নিয়োজিত করা। কারণ সময় এমন একটি সম্পদ, যা একবার চলে গেলে আর ফিরিয়ে আনা যায় না।

৪. জ্ঞান অর্জন

জ্ঞান অর্জনের জন্য তারুণ্যই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময়ে মানুষের তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তি থাকে এবং দায়িত্বও কম থাকে। সাধারণভাবে তরুণরা বয়স্কদের তুলনায় দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে বলেও মনে করা হয়।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এর একটি ভালো উদাহরণ। মহানবী (সা.)-এর এই তরুণ সাহাবি জ্ঞান অর্জনের প্রতি গভীর মনোযোগ দিয়ে বয়স্ক সাহাবিদের সাথে জ্ঞানের ক্ষেত্রে সামনের সারিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বয়সে প্রবীণ হওয়ার পরও তার জ্ঞান ও মতামতের জন্য মানুষ তার শরণাপন্ন হতো। এভাবেই তিনি ঐশী বার্তার উত্তরাধিকার বহন করে গেছেন।

মহানবী (সা.) একটি হাদিসে মুমিনদের জ্ঞান অর্জনের পথে চলতে উৎসাহ দিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। (মুসলিম)

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, শরিয়াহর বিধান এবং একাডেমিক জ্ঞান এসবের সমন্বিত জ্ঞান একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে। আর সেই জ্ঞান এমন কর্মে প্রকাশ পায়, যা ব্যক্তি নিজে ও অন্যদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই শরীরে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে। সেটি ভালো হলে পুরো শরীর ভালো হয়ে যায়, আর সেটি নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। (বুখারি)

উপরের হাদিসে বুঝানো হয়েছে, মানুষের অন্তর্জগতের সাথে তার বাহ্যিক কাজকর্মের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নিজের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করলে খারাপ গুণগুলো দূর করার এবং ভালো গুণগুলো নিজেদের মধ্যে ধারণ করার সুযোগ তৈরি হয়। তরুণরা পৃথিবীকে ভালো করার জন্য যতটা পরিবর্তন আনতে চায়, নিজেদের পরিবর্তনের দিকেও তাদের ততটাই মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

৫. সক্রিয় অংশগ্রহণ

সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা বা সমাজে অবদান রাখা তরুণদের শক্তি ও সৃজনশীলতাকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর অন্যতম সেরা উপায়। তরুণদের উদ্যম নিঃসন্দেহে সমাজকে আরও এগিয়ে নিতে ও সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখবে।

তবে এর আগে প্রয়োজন নিজের মধ্যে সঠিক জ্ঞানের শক্ত ভিত্তি তৈরি করা, যার কথা ওপরের আলোচনায় বলা হয়েছে। বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া আমাদের বসবাসের পৃথিবীর অবস্থার উন্নয়নের একটি প্রচেষ্টা। সামগ্রিক সমাজের জন্য মুমিনরা একটি বড় নিয়ামত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরাই মানবজাতির কল্যাণের জন্য আবির্ভূত শ্রেষ্ঠ জাতি। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)