...|...|...

ধর্ম

জুমার খুতবার সময় দান সংগ্রহ, শরিয়তের বিধান কী

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:০৮
Shares
জুমার খুতবার সময় দান সংগ্রহ, শরিয়তের বিধান কী

ছবি: সংগৃহীত

জুমার খুতবা চলাকালে মুসল্লিদের মধ্যে দানবাক্স বা ব্যাগ ঘুরিয়ে টাকা সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে অনেক মসজিদে। তবে এ সময় অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে মুসল্লিদের খুতবা শোনায় মনোযোগ ব্যাহত হতে পারে। ইসলামে দান-সদকা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত হলেও খুতবা শোনার গুরুত্বও অপরিসীম। তাই খুতবার সময় দান সংগ্রহের পদ্ধতি শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা জানা প্রয়োজন।

শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ইমাম খুতবা দেন। এ সময় মুসল্লিদের নীরব থেকে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার নির্দেশনা রয়েছে। কোরআন, সুন্নাহ ও ফকিহদের বক্তব্যের আলোকে খুতবার সময় কথা বলা কিংবা মনোযোগ নষ্ট হয় এমন কাজে লিপ্ত হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সেই বিবেচনায় মসজিদে দান সংগ্রহের সময় ও পদ্ধতি নিয়েও সচেতন থাকা জরুরি।

জুমার খুতবার গুরুত্ব

জুমার নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)

এ থেকে বোঝা যায়, জুমার খুতবা কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয় বরং এটি ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই খুতবা চলাকালে মনোযোগ ধরে রাখা মুসল্লিদের দায়িত্ব। (তাফসিরুল ওয়াসিত লিল-কুরআনিল কারিম, ৩/১৪১৯, মাজমাউল বুহুস আল-ইসলামিয়া, আল-আজহার, ১৯৯২)

খুতবার সময় নীরব থাকার নির্দেশ

খুতবা চলাকালে নীরব থাকা এবং মনোযোগ দিয়ে বক্তব্য শোনার বিষয়ে রাসুল (সা.) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে তিনি বলেন, ‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি যদি তোমার সাথীকে বলো, “চুপ থাকো”, তবে তুমিও অনর্থক কাজে লিপ্ত হলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)

হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, খুতবা চলাকালে অন্যকে নীরব থাকতে বলার মতো কথাও অনর্থক কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে টাকা বের করা, দানবাক্স বা ব্যাগ এক মুসল্লির কাছ থেকে অন্য মুসল্লির কাছে পৌঁছে দেওয়া কিংবা টাকা গোনার মতো কাজ খুতবা শোনার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ যখন এমন অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করে যে ইমাম মিম্বরে অবস্থান করে খুতবা দিচ্ছেন, তখন ইমাম খুতবা শেষ না করা পর্যন্ত সে কোনো নামাজ আদায় করবে না এবং কোনো কথাও বলবে না।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শরহি সহিহিল বুখারি, ২/৪০৯, দারুল মারিফাহ, বৈরুত)

খুতবার সময় দান সংগ্রহের বিধান

ইসলামে দান-সদকা নেকির কাজ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দান করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো নফল বা মুস্তাহাব কাজ করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটানো উচিত নয়।

জুমার খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা মুসল্লির জন্য ওয়াজিব বলে ফকিহরা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, মসজিদ বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য দান করা নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। তাই দান সংগ্রহের কারণে যদি খুতবা শোনায় ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে সেই পদ্ধতি খুতবার আদবের পরিপন্থি বলে বিবেচিত হয়।

মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। তবে অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত, যাতে মুসল্লিদের ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট না হয়। এ বিষয়ে ফকিহদের আলোচনায় খুতবার সময় মনোযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এমন কাজ থেকে বিরত থাকার নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়েক শরহু কানজিদ দাকায়েক, ২/২৫৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)

দান সংগ্রহের উপযুক্ত সময় ও পদ্ধতি

খুতবার সময় দান সংগ্রহ নিয়ে আলোচনা করার অর্থ দান-সদকাকে নিরুৎসাহিত করা নয়। বরং মূল বিষয় হলো, দান সংগ্রহ করতে গিয়ে যেন খুতবা শোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ব্যাহত না হয়।

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যে কল্যাণকর বস্তু ব্যয় করবে, আল্লাহ তা অবশ্যই জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩)

এসব নির্দেশনা অনুযায়ী, মসজিদসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে দান করা প্রশংসনীয় কাজ। তবে দান সংগ্রহের সময় নির্ধারণে খুতবার মর্যাদা ও মুসল্লিদের মনোযোগের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে মসজিদ কর্তৃপক্ষ খুতবা শুরুর আগে অথবা জুমার নামাজ শেষ হওয়ার পর দান সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে পারে। মসজিদের প্রবেশপথে স্থায়ী দানবাক্স রাখা কিংবা নামাজের আগে দানের উদ্দেশ্য জানিয়ে অর্থ সংগ্রহ করাও বিকল্প পদ্ধতি হতে পারে। এতে দানের সুযোগ অক্ষুণ্ন থাকবে, পাশাপাশি খুতবার সময় মুসল্লিরা মনোযোগ দিয়ে ইমামের বক্তব্য শুনতে পারবেন।