...|...|...

জাতীয়

জমির নামজারিতে নতুন যে পরিবর্তন এলো

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১১:১৭ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:০৫
Shares
জমির নামজারিতে নতুন যে পরিবর্তন এলো

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম কার্যকর করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বণ্টননামা ছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি আলাদা খতিয়ানে নামজারি করা যাবে না। সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তবে ওয়ারিশরা চাইলে পরবর্তী সময়ে নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামার মাধ্যমে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে পারবেন। অর্থাৎ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে-‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ বিষয়ে পরিবর্তিত নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছিল। এখন তা কার্যকর করা হয়েছে।

নতুন নিয়মে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হবে না।

যৌথ নামজারির আবেদনের সময় সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে আবেদন করা হলে তা নামঞ্জুর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করা যাবে না। আগে অনেক ক্ষেত্রে বণ্টননামা না থাকায় যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করা হতো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, নতুন নিয়মের ফলে একজন ওয়ারিশ অন্যদের বাদ দিয়ে পুরো জমি নিজের নামে নামজারি করে নেওয়ার সুযোগ কমবে।

ওয়ারিশরা যদি নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের অংশ আলাদা করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিল করতে হবে।

অর্থাৎ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে এখন দুটি পদ্ধতি রয়েছে- যৌথ নামজারি, যেখানে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে থাকবে এবং প্রত্যেকের হিস্যা উল্লেখ থাকবে। এ ক্ষেত্রে বণ্টননামা প্রয়োজন নেই। এছাড়া পৃথক নামজারি, যেখানে জমি ভাগ করে আলাদা খতিয়ান করতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা থাকতে হবে।

জমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বা মিউটেশন বলা হয়।

নামজারি না করলে মালিকানা নিয়ে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্য ওয়ারিশ বা অবৈধ দখলদার জমির ওপর দাবি তুলতে পারে। একই সঙ্গে নিজ নামে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে।

বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়। নির্ধারিত ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর সাধারণত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রক্রিয়াটি নিষ্পত্তির লক্ষ্য রয়েছে।

নতুন বিধানের ফলে নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া জমি কেনাবেচা, দান বা হেবা করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে জমি সংক্রান্ত লেনদেনের সময় সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও মালিকানার রেকর্ড যাচাই করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে যাদের নামজারি আগেই সম্পন্ন হয়েছে এবং খতিয়ান সঠিক রয়েছে, তাদের নতুন করে নামজারি করার প্রয়োজন নেই। পুরোনো নামজারি রেকর্ড অনলাইনে ডিজিটাল সিস্টেমে রয়েছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইনজীবী ও ভূমি-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নিয়মের ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

প্রথমত, কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে একজন বা কয়েকজনের নামে জমি নামজারি করে নেওয়ার সুযোগ কমবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত ওয়ারিশদের মালিকানা স্পষ্টভাবে উঠে আসবে। তৃতীয়ত, জমি নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধ ও মামলা কমতে পারে।

বিশেষ করে নারী ওয়ারিশদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় যৌথ নামজারির বিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।

তবে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নে কিছু সমস্যার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক পরিবারের কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকেন কিংবা দীর্ঘদিন যোগাযোগের বাইরে থাকেন। ফলে সব ওয়ারিশের তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একসঙ্গে সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া পৃথক খতিয়ানের জন্য নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ প্রয়োজন হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নামজারি শেষ করতে ভূমি অফিসগুলোতেও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন নিয়ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে জানানো জরুরি। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হলে মানুষ নিজের জমির মালিকানা ও ওয়ারিশদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন হবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জমি কেনার পর দ্রুত নামজারির আবেদন করা উচিত। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে পরিবারের সব ওয়ারিশকে নিয়ে যৌথ নামজারি করাই নিরাপদ। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে প্রত্যেকে নিজের অংশ আলাদা খতিয়ানে নিতে পারবেন।

নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সরকারি ভূমি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের নাম নিশ্চিত করা, ওয়ারিশদের অধিকার সুরক্ষা দেওয়া এবং জমি নিয়ে বিরোধ ও প্রতারণার সুযোগ কমানো।