...|...|...

জাতীয়

বিশ্ব শিক্ষক দিবস

ছাত্রদের জন্য জীবন উৎসর্গকারী প্রথম শহীদ শিক্ষক শামসুজ্জোহা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১০:০৪ | আপডেট: ৫ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:২৯
Shares
ছাত্রদের জন্য জীবন উৎসর্গকারী প্রথম শহীদ শিক্ষক শামসুজ্জোহা

ছাত্রদের জীবন রক্ষায় পাকিস্তানি সেনাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণ দেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন তিনি। তাকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

শামসুজ্জোহার মৃত্যু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলমান স্বাধিকার আন্দোলনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তার আত্মত্যাগ আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথকে ত্বরান্বিত করার অন্যতম ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৬৯ সালে ছয় দফা ও ১১ দফা দাবিতে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে গণআন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান আসাদ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিলের প্রস্তুতি নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা অবস্থান নিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেনাসদস্যদের সামনে এগিয়ে যান। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে গুলি না চালানোর অনুরোধ করেন।

শিক্ষার্থীদের দিকে সেনারা অস্ত্র তাক করলে শামসুজ্জোহা হাত উঁচু করে তাদের থামানোর চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, তিনি সেনাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার! আমার ছাত্ররা এখান থেকে এখনই চলে যাবে।’

কিন্তু তার অনুরোধ উপেক্ষা করে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালায়। একইসাথে তাকে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে অস্ত্রোপচারের সময় তার মৃত্যু হয়।

সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহার জন্ম ১৯৩৪ সালের ১ মে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায়। বাঁকুড়া জেলা স্কুল ও বাঁকুড়া খ্রিষ্টান কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৫৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের সাথেও তিনি যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে গবেষণা করেন। ১৯৬৪ সালে পিএইচডি ও ডিআইসি ডিগ্রি অর্জন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে অধ্যাপনায় যোগ দেন।

১৯৬১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়া শামসুজ্জোহা ১৯৬৬ সালে রিডার পদে উন্নীত হন। তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক ও পরে প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব নেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও তার আগ্রহ ছিল। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হকি দলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন।

শামসুজ্জোহার মৃত্যুর পর তার আত্মত্যাগের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তার মৃত্যু নতুন মাত্রা যোগ করে। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।

স্বাধীনতার পর শামসুজ্জোহাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে সম্মানিত করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হল তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। নাটোরে তার নামে কলেজও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে নিয়মিত ‘জোহা সিম্পোজিয়াম’ আয়োজন করা হয়। ২০০৮ সালে তিনি স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন।

শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগের স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছেও নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়। আন্দোলনকর্মী আবু সাঈদ ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার এক দিন আগে, ১৫ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শামসুজ্জোহাকে স্মরণ করে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন।

সেখানে তিনি শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। পোস্টে তিনি শামসুজ্জোহাকে এমন একজন শিক্ষক হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি শিক্ষার্থীদের রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

প্রায় পাঁচ দশক পরও শামসুজ্জোহার সেই আত্মত্যাগের স্মৃতি এভাবেই ফিরে আসে নতুন প্রজন্মের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে।

১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রক্ষায় নিজের জীবন উৎসর্গ করা ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একজন শিক্ষক নন ছাত্রদের নিরাপত্তা ও মানবিক দায়িত্ববোধের এক স্মরণীয় প্রতীক।