...|...|...

সারাদেশ

চিকিৎসকের ছোট্ট ভুলেই আর মা হতে পারবেন না কুলসুম

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:০২
Shares
চিকিৎসকের ছোট্ট ভুলেই আর মা হতে পারবেন না কুলসুম

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

২০২০ সালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক চিকিৎসা নিয়েও আর সন্তান ধারণ করতে পারছিলেন না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার গৃহবধূ কুলসুম আক্তার। দীর্ঘ ছয় বছর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায়, তার দুই ফ্যালোপিয়ান টিউবই বন্ধ। পরে অস্ত্রোপচার করে টিউব দুটির সংযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এখন স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা খুবই কম বলে দাবি করছেন কুলসুমের স্বামী শামসুজ্জামান সবুজ।

কুলসুমের পরিবারের অভিযোগ, ২০২০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় তার অনুমতি ছাড়াই দুই ফ্যালোপিয়ান টিউব কেটে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই অস্ত্রোপচার করেছিলেন গাইনি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জিনান রেজা। তবে চিকিৎসক এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বলছে, তাদের নথিপত্রে কুলসুমের লাইগেশন করার কোনো তথ্য নেই।

অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২ জানুয়ারি দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি হন কুলসুম আক্তার। ওই দিন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। চারদিন পর মা ও শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু ১০ এপ্রিল মাত্র চার মাস বয়সে শিশুটির মৃত্যু হয়।

সন্তান হারানোর পর আবারও সন্তান নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন কুলসুম ও তার স্বামী। স্থানীয় চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এমনকি কবিরাজি চিকিৎসাও নেন তারা। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সন্তান না হওয়ায় কারণ খুঁজতে শুরু করেন। এক চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানোর পর কুলসুমের দুই ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে।

বিষয়টি নিশ্চিত হতে গত ২ এপ্রিল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কুলসুমের ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচার করা হয়। সেখানেও দুই টিউব বন্ধ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এরপর সন্তান ধারণের শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। গত ২৩ আগস্ট সেখানে ভর্তি হওয়ার পর ৮ সেপ্টেম্বর কুলসুমের ‘মাইক্রোসার্জিক্যাল রিক্যানালাইজেশন’ বা টিউব পুনঃসংযোগের অস্ত্রোপচার করা হয়।

ওসমানী মেডিকেল কলেজের অপারেশন নোটে বলা হয়েছে, কুলসুমের ডান ও বাম উভয় পাশের ফ্যালোপিয়ান টিউব ‘ইস্থমাস’ অংশে শক্ত করে লাইগেশন করা ও কাটা ছিল। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউব দুটির ব্লকেজ অপসারণ করে পুনরায় সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এরপরই ২০২০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে কুলসুমের অস্ত্রোপচারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই বছরের ২ জানুয়ারির অস্ত্রোপচার কক্ষের রেজিস্টার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০ নম্বর ক্রমিকে কুলসুমের অপারেশনের বিবরণে শুধু ‘লোয়ার ইউটেরিন সিজারিয়ান সেকশন’ উল্লেখ রয়েছে। সেখানে লাইগেশন করার কোনো তথ্য নেই।

ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে গত ২১ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে লিখিত আবেদন করেন কুলসুমের স্বামী শামসুজ্জামান সবুজ। তিনি ওই সময়ের চিকিৎসার মূল নথিপত্রও চেয়েছেন।

শামসুজ্জামান সবুজ বলেন, ছয়টি বছর আমার চোখের জলে কেটেছে। এখনো আমার স্ত্রী অসুস্থ। বেঁধে রাখা টিউব জোড়া লাগানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বাধা থাকায় টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন সন্তান ধারণের সম্ভাবনা খুব কম। আমি চিকিৎসকের বিচার চাই।

অভিযোগ অস্বীকার করে চিকিৎসক জিনান রেজা বলেন, এটি ২০২০ সালের ঘটনা। একজন রোগীর সব চিকিৎসা কার্যক্রম রেজিস্টার খাতায় লেখা থাকে। ওই রোগীর স্থায়ী লাইগেশন হয়েছে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ হাসপাতালের ওটির রেজিস্ট্রারে নেই। ওই রোগীর কোনো লাইগেশন করা হয়নি। আমি অনুমতি ছাড়া রোগীর লাইগেশন করিনি। রোগী ও তার স্বজনের অনুমতি ছাড়া স্থায়ী বন্ধ্যত্বকরণ করা হয় না। আমরা কুমিল্লা মেডিকেলের প্রতিবেদনের বিষয়ে তাদের সাথে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছে তারা ওই রোগীর টিউব ব্লকের কথা উল্লেখ করেছে। আর টিউব ব্লক ইনফেকশন বা নানা কারণে হয়ে থাকতে পারে। আমরা সাধারণত দলগতভাবে কাজ করি। তখনও আমি দলগত কাজের অংশ ছিলাম।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রতন কুমার ঢালী বলেন, ওই রোগীর স্বজন হাসপাতালে একটি অভিযোগ করেছিল। ছয় বছর আগের ঘটনা এটি। নথিপত্র ঘেঁটে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের তথ্য রেজিস্ট্রারে আছে। কিন্তু ওই রোগীর লাইগেশন করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য হাসপাতালের নথিতে নেই। গৃহবধূর স্বামীর সামনেই সব নথি উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই রোগীর অন্যান্য প্রতিবেদন দেখে আমাদের ধারণা, অন্য কোথাও তার অস্ত্রোপচার হয়ে থাকতে পারে।

জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোগীর অনুমতি ছাড়া সার্জনরা লাইগেশন করার কোনো সুযোগ নেই। সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের ওটি নোট কিংবা কোথাও ওই রোগীর লাইগেশনের কথা উল্লেখ নেই। ঘটনাটি আসলে কী ঘটেছে, তা তদন্ত করে দেখতে হবে।