...|...|...

সারাদেশ

চট্টগ্রাম আরএনবিতে অনিয়মের অভিযোগ, স্কর্ট ডিউটির নামে ভুয়া বিল

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৫৪
Shares
চট্টগ্রাম আরএনবিতে অনিয়মের অভিযোগ, স্কর্ট ডিউটির নামে ভুয়া বিল

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) অস্ত্র শাখায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শাখার ৮০ জন সদস্যের মধ্যে ২০ জনের বেশি সদস্য মাসের পর মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন ও ভ্রমণ ভাতা (টিএ/ডিএ) উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ট্রেনের স্কর্ট ডিউটির নামে ভুয়া ভ্রমণ বিল তৈরি, রেলের জমি ও অবৈধ দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় এবং বাহিনীর সদস্যদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এসব অনিয়মের নেপথ্যে আরএনবির চিফ ইন্সপেক্টর (সিআই) ও সহকারী কমান্ড্যান্টের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ সালামত উল্লাহর নাম উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের স্বচ্ছতার দাবি করেছেন তিনি।

আরএনবি সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্র শাখায় ‘ভগবান ডিউটি’ নামে একটি অলিখিত ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ ব্যবস্থার আওতায় কিছু সদস্য নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করেও পূর্ণ বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়।

সূত্রের দাবি, হাবিলদার মো. ইউসুফ পাটোয়ারী, সিপাহী মো. আরিফুল ইসলাম, জিয়া উদ্দিন, মো. সোহেল রানা, কেশুয়া চন্দ্র কপালী, মো. নাজিম উদ্দীন চৌধুরী, মিঠুন চক্রবর্তী, আজিমুল হক সুমন ও মো. মিজানুর রহমানসহ ২০ জনের বেশি সদস্য নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না।

এ ছাড়া হাবিলদার মো. মনির হোসেন, হাবিলদার মো. জয়নাল আবেদিন, সিপাহী কেশুয়া চন্দ্র কপালী ও সিপাহী মোহাম্মদ মাহমুদুল ইসলাম মাসে মাত্র চার থেকে পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করেও পুরো মাসের বেতন উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সুবিধার বিনিময়ে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহকে দিতে হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।

ডিউটিতে অনুপস্থিত থেকেও টিএ বিল উত্তোলন:

বেতন-ভাতার পাশাপাশি ভ্রমণ ভাতা উত্তোলনেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালন না করেও কোনো কোনো সদস্যের নামে মাসে ২৬ থেকে ২৮ দিনের টিএ বিল তৈরি করে টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। এর মধ্যে হাবিলদার মো. ইউসুফ পাটোয়ারীর নামে গত মার্চ মাসে ২৬ দিনের ভ্রমণ ভাতা বাবদ ১৩ হাজার ৭৭৭ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ট্রেনের স্কর্ট ডিউটির নামে ভুয়া বিল:

ট্রেনের স্কর্ট ডিউটির নামেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, সাত থেকে আটটি ট্রেনের স্কর্ট ডিউটির নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা সিপাহী আজিমুল হক সুমন ও সিপাহী মো. মিজানুর রহমানের নামে ‘ফাইভ আপ’ ট্রেনে ডিউটি দেখিয়ে ভ্রমণ ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া সিপাহী ওমর ফারুক, মো. মতিয়ার, মো. শাহাদাত হোসাইন খোকন ও মো. এনামুল হোসেন নামের চার সদস্যের বিরুদ্ধে ইন্সপেক্টরের বাসায় ব্যক্তিগত কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করে ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত থাকলেও তাদের নামে নিয়মিত ভ্রমণ ভাতা উত্তোলন করা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
রেলের জমি ও অবৈধ দোকান থেকে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ বেতন-ভাতা ও ভ্রমণ বিলের অনিয়মের পাশাপাশি রেলের জমি, অবৈধ স্থাপনা ও ভাসমান দোকান থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রেলের জায়গায় গড়ে ওঠা দোকান, বস্তিঘর ও অবৈধ স্থাপনা থেকে মাসিক ও দৈনিক ভিত্তিতে টাকা আদায় করা হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, টাইগারপাস ঘুরাইন্না গেটে রেলওয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে থাকা ৬০ থেকে ৭০টি ভাসমান দোকান থেকে দোকানপ্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা হয়। পোস্তারপাড় এলাকায় বস্তিঘর ও ছাগলের বাজার থেকে মাসে ১৩ হাজার টাকা, কদমতলীতে ফোর স্টার সিএনজি পাম্পের বিপরীতে রেলের কোয়ার্টারের ভেতরে ফলের ক্যারেট রাখার জন্য মাসে চার হাজার টাকা এবং ফলমন্ডি এলাকায় রেলের কোয়ার্টার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া হাটহাজারীর জান আলী হাট এলাকায় রেললাইনসংলগ্ন অবৈধ স্থাপনা থেকে মাসে ২৫ হাজার টাকা এবং সিআরবি এলাকায় অবৈধ স্থাপনা থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা ও মাসিক তিন হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, টাইগারপাস এলাকার এসব টাকা শাহীন নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। পরে তা সংগ্রহ করেন আরএনবির সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, যিনি ‘সুন্দরী জসিম’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া নগরীর আকবর শাহ এলাকার পাঞ্জাবি লেন ও শহীদ লেনে বাসা উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে ঘরপ্রতি চার হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, আদায় করা এসব অর্থের একটি বড় অংশ ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।

অভিযোগ অস্বীকার সালামত উল্লাহর:

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আরএনবির চিফ ইন্সপেক্টর ও সহকারী কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ সালামত উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা হিংসার বশবর্তী হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কাছে এসব ভুয়া তথ্য দিচ্ছেন। তবে কারা এসব করছেন, তাদের নাম বলতে পারব না। আমার এখানে এসব বিষয়ে কোনো জালিয়াতি করার সুযোগ নেই। আমি আমার অবস্থান থেকে স্বচ্ছতা বজায় রেখেছি।’

এসআই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সালামত উল্লাহ বলেন, ‘তিনি আমাদের একজন সাব-ইন্সপেক্টর। তার দায়িত্ব মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা এবং নতুন করে কেউ যাতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারে, তা দেখভাল করা। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই।’

তবে এসআই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।