কক্সবাজারের চকরিয়ায় আলোচিত ছাত্রদল নেতা মো. জিসান অপহরণ পরবর্তী হত্যার ঘটনায় আরও একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অপহরণের ঘটনায় ব্যবহৃত মাইক্রোবাসও জব্দ করেছে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরাসরি জড়িত দুইজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে চকরিয়া সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আবদুল আজিজ ও চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- আনোয়ার হোসেন প্রকাশ কালু ড্রাইভার (৪৫) । তিনি উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের দক্ষিণ লোটনী এলাকার আবু বক্করের ছেলে এবং জিসাত মিয়া প্রকাশ শওকত ড্রাইভার (২৯)। তিনি উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট ছগিরশাহ কাটার বাহাদুর আলমের ছেলে।
মামলার বাদীর করা চকরিয়া থানায় এজাহার দায়ের করা এজাহার সুত্রে জানা গেছে, গত ২৭/০৯/২০২৬ দিবাগত রাত আনুমানিক ১২:০০ ঘটিকা হতে ২৮/০৯/২০২৬ রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে চকরিয়া থানাধীন কাকারা ইউনিয়নের ০৪নং ওয়ার্ডের মাইজ কাকারা এলাকার ছাবের সওদাগরের দোকানের সামনে যুবদল নেতা মো. জিসান (২৬)-কে কয়েকজন ব্যক্তি একটি সাদা রঙের নোহা গাড়িতে করে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
একই সময় রাত আনুমানিক ৩টার দিকে মালুমঘাট হাইওয়ে থানা পুলিশের মাধ্যমে চকরিয়া থানায় খুটাখালী ইউনিয়নের মেধাকচ্ছপিয়া এলাকায় সড়কের পাশে একটি অজ্ঞাতনামা লাশ পড়ে থাকার সংবাদ আসে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লাশটি উদ্ধার করে এবং স্বজনদের মাধ্যমে লাশটি অপহৃত যুবদল নেতা মো. জিসান (২৬)-এর বলে শনাক্ত করা হয়।
উক্ত ঘটনায় ভিকটিমের ভাই কাইচার হামিদ বাদী হয়ে চকরিয়া থানায় এজাহার দায়ের করেন। তিনি উক্ত এজাহারে রেজিয়া সুলতানা, নাজিম উদ্দিন, বেগম নাজিম উদ্দিন, মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ জকরিয়া, মিনহাজ উদ্দিন এবং একে তারেকসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেন।
পুলিশি তৎপরতা, মূল রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেফতার
মামলা পূর্ববর্তী জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ এর মাধ্যমে চকরিয়া থানা পুলিশ অপরহন সংক্রান্ত বিষয় অবগত হয়ে উদ্ধারে সহযোগিতার জন্য আভিযানিক দল কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমে ভিকটিম পরিবার জানায় ভিকটিম জিসানকে ১টি সাদা নোহা যোগে অপহরণ করে চকরিয়া পৌরসভা সবুজবাগ এলাকার কবির টাওয়ারে আটক করে রেখেছে।
তখন চকরিয়া থানা পুলিশ দ্রুত সেখানে উপস্থিত হয়ে উক্ত টাওয়ারের বিভিন্ন ফ্লোরে অভিযান চালায় এবং সিসি টিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। কিন্তু উক্ত স্থানে অপহৃত জিসানের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় উক্ত বিল্ডিং এর লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে রাত অনুমান ৩ ঘটিকার সময় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের মোবাইলে একটি কল আসে, মালুমঘাট মেধা কচ্ছপিয়া হাইওয়েতে এক জন ব্যক্তির পড়ে আছে। বিষয়টি সন্দেহের অবতারণা হলে তাৎক্ষণিক ওসি আভিযানিক দল নিয়ে উক্ত স্থানে গিয়ে একজন ব্যক্তিকে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখা যায় তখন ভিকটিম পরিবার লাশ দেখে মৃত জিসানকে সনাক্ত করেন।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় তথ্য-প্রয়ুক্তি, সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা, বিভিন্ন গোয়েন্দা ও স্থানীয়দের সহায়তায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই এর ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করেন।
সবকিছু যাচাই-বাছাই করে আনোয়ার হোসেন প্রকাশ কাল্লু ড্রাইভারকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাত্রী বেলা তার নিজ বাড়ি লোটনী এলাকা হতে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আনোয়ার হোসেন প্রকাশ কাল্লু ড্রাইভার যুবদল নেতা জিসান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিকল্পনা এবং কিলিং মিশনে অংশগ্রহণে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে এবং যুবদল নেতা জিসান হত্যায় অর্থায়ন, পরিকল্পনা ও কিলিং মিশন অংশগ্রহণকারী সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে। তিনি নিজেকে জড়িয়ে বিজ্ঞ আদালতে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ও তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় মামলার ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত জিসাত মিয়া প্রকাশ শওকত ড্রাইভার (২৯) সোমবার (৫ অক্টোবর ) ভোরবেলা তার নিজ বাড়ি রিংভং এলাকা হতে অভিযান পরিচালনা করে গ্রেফতার করা হয়। তার শনাক্তমতে অপহরণ এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিলভার রঙের নোহা গাড়ি (চট্টমেট্রো-চ-১১-৫৯৬৯) জব্দ করা হয়।
ধৃত আসামিদের বরাত দিয়ে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, এজাহারনামীয় ১নং আসামি রেজিয়া সুলতানার সাথে ভিকটিম যুবদল নেতা জিসানের সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং ব্যবসার জন্য ভিকটিমকে টাকা প্রদান করেন। এই ধারের টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মনমালিন্য চলে আসছে। তার ধারবাহিকতায় রেজিয়া সুলতানার ভাই বিদেশে অবস্থানরত মিজানের সাথে ভিকটিমের ফোনে কথা কাটাকাটি ও ভিকটিমকে হত্যার হুমকি দেয়। পরবর্তী রেজিয়াসহ বিদেশ অবস্থানরত আসামিরা ভিকটিমকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
কিলিং মিশনের জন্য আনোয়ার হোসেন কালু ড্রাইভারসহ অপর আসামিরা ভিকটিম জিসানকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি ব্যবস্থা করতে বলে। তৎপ্রেক্ষিতে উক্ত আনোয়ার হোসেন ও তদন্তে প্রকাশিত ব্যক্তি মালুমঘাট এলাকার একটি ভাড়াটে অপহরণকারী ও খুনি দলকে ভাড়া করে।
তিনি আরও বলেন, তার ধারাবাহিকতায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা হতে রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টা ঘটিকার মধ্যে চকরিয়া থানাধীন কাকারা ইউনিয়নের ০৪নং ওয়ার্ডের মাইজ কাকারা এলাকার
ছাবের সওদাগরের দোকানের সামনে হতে ভিকটিম জিসানকে অপহরণ করে নিয়ে গুরুতর জখম করে হত্যা করে লাশ চকরিয়া থানাধীন খোটাখালীস্থ মেধা কচ্ছপিয়া নামক জায়গা হাইওয়ে রাস্তার ধারে লাশ ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। এজাহারনামীয় আসামি সহ ঘটনায় জড়িত সব আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে।


