ইসলাম মানবজাতির জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের জীবনব্যবস্থা। সমাজ ও ব্যক্তির ধ্বংস ডেকে আনে এমন সব কাজকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম উম্মাহকে এমন সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ বা মহাপাপ (কবিরা গুনাহ) থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যা মানুষের ইহকাল ও পরকাল উভয়ই বরবাদ করে দেয়।
নিচে কোরআন ও হাদিসের আরবি রেফারেন্স ও বাংলা অনুবাদসহ সেই সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর সাথে শরিক করা (শিরক)
ইসলামের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো আল্লাহর ইবাদত বা বৈশিষ্ট্যে অন্য কাউকে অংশীদার করা। এটি মানুষের সমস্ত নেক আমল ধ্বংস করে দেয়।📖 আল-কোরআনের নির্দেশ:إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُঅনুবাদ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করা ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮)📜 আল-হাদিসের সতর্কতা:عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: سَأَلْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ؟ قَالَ: أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَঅনুবাদ: হজরত ইবনে মাসুদ (রা.) বলেন, আমি নবী কারিম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন: ‘আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৪৪৭৭)
২. জাদুবিদ্যা (সেহর)জাদু করা
জাদুর আশ্রয় নেওয়া বা কুফরি কালামের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরির শামিল। এটি পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ধ্বংস করে।📖 আল-কোরআনের নির্দেশ:وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَىٰঅনুবাদ: ‘জাদুকর যেখানেই আসুক না কেন, সে সফল হবে না।’ (সূরা ত্বহা, আয়াত: ৬৯)📜 আল-হাদিসের সতর্কতা:عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّরَ أَوْ تُطُيِّرَ لَهُ، أَوْ تَكَهَّنَ أَوْ تُكُهِّنَ لَهُ، أَوْ سَحَرَ أَوْ سُحِرَ لَهُঅনুবাদ: হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘সে ব্যক্তি আমাদের দলের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ভাগ্য পরীক্ষা করল কিংবা যার ভাগ্য পরীক্ষা করা হলো, যে গণকতাবিদ্যা করল কিংবা যার জন্য গণকতাবিদ্যা করা হলো, যে জাদু করল কিংবা যার জন্য জাদু করা হলো।’ (আল-মুজামুল কাবির, হাদিস: ৩৫৫)
৩. অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণ হত্যা করা
আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে সম্মানিত ও নিরাপদ করেছেন। কোনো বৈধ আইনি কারণ ছাড়াই কোনো মানুষকে হত্যা করা পুরো মানবজাতিকে হত্যার শামিল।📖 আল-কোরআনের নির্দেশ:وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّতَعَمِّدًا فَজَাজَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَاঅনুবাদ: ‘আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯৩)📜 আল-হাদিসের সতর্কতা:عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَنْ يَزَالَ الْمُؤْمِنُ فِي فُসْحَةٍ مِنْ دِينِهِ، مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًاঅনুবাদ: হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘একজন মুমিন তার দ্বীনের ব্যাপারে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশস্ত অবকাশের মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না সে কোনো হারাম রক্তপাত (অন্যায় হত্যা) ঘটায়।’ (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৬৮৬২))
৪. সুদের কারবার (রিবা)
সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজের দরিদ্র শ্রেণিকে শোষণ করে এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য ধ্বংস করে। ইসলামে সুদের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।📖 আল-কোরআনের নির্দেশ:... وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا ...অনুবাদ: ‘অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৭৫)📜 আল-হাদিসের সতর্কতা:عَنْ جَابِرٍ قَالَ: لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا، وَمُوكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌঅনুবাদ: হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) লানত (অভিশাপ) করেছেন সুদখোরের ওপর, সুদদাতার ওপর, সুদের হিসাব লেখক এবং তার সাক্ষীদ্বয়ের ওপর। তিনি বলেছেন, ‘অপরাধের দিক থেকে তারা সকলেই সমান।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
৫. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা
অসহায় ও অভিভাবকহীন এতিমদের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। পক্ষান্তরে, জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে তাদের সম্পদ গ্রাস করা ধ্বংসাত্মক পাপ।📖 আল-কোরআনের নির্দেশ:إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًاঅনুবাদ: ‘নিশ্চয়ই যারা এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা তাদের পেটে আগুনই ভর্তি করে।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০)📜 আল-হাদিসের সতর্কতা:عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ قَالَ: أُحَرِّجُ حَقَّ الضَّعِيفَيْنِ: الْইَتِيمِ، وَالْمَرْأَةِঅনুবাদ: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে দুটি দুর্বল শ্রেণির অধিকার নষ্ট করা থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করছি; তারা হলো এতিম এবং নারী।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৬৭৮)
৬. জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া
দেশ ও ধর্মের সুরক্ষায় শত্রুর মুখোমুখি হয়ে ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া কাপুরুষতা। এটি মুসলিম সমাজের মনোবল ভেঙে দেয় এবং চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।📖 আল-কোরআনের নির্দেশ:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَঅনুবাদ: ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন কাফেরদের মুখোমুখি হবে (যুদ্ধক্ষেত্রে), তখন তাদের থেকে পিঠ প্রদর্শন করো না (পালিয়ে যেও না)।’ (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১৫)📜 আল-হাদিসের সতর্কতা:عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: الكَبَائِرُ: الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ، وَقَتْلُ النَّفْسِ، وَالفِرَارُ مِنَ الزَّحْفِঅনুবাদ: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কবিরা গুনাহসমূহ হলো: ‘আল্লাহর সাথে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস
৭. সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া
কোনো পবিত্র, চরিত্রবান ও সরলমনা নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচার বা চরিত্রহীনতার মিথ্যা অপবাদ দেওয়া জঘন্য অপরাধ। এটি সামাজিক শান্তি ও পারিবারিক মর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়।📖 আল-কোরআনের নির্দেশ:إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِঅনুবাদ: ‘নিশ্চয়ই যারা সতী-সাধ্বী, সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৩)📜 আল-হাদিসের সতর্কতা:عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ: قَذْفُ الْمُحْصَنَةِ يَهْدِمُ عَمَلَ مِائَةِ سَنَةٍঅনুবাদ: হজরত হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কোনো পবিত্র নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া মানুষের একশত বছরের (নেক) আমল ধ্বংস করে দেয়।’ (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৪০২৬)📜 মূল হাদিসের সমন্বিত রেফারেন্স:এই সাতটি ধ্বংসাত্মক মহাপাপের কথা আল্লাহর রাসুল (সা.) এক এক করে বুখারি ও মুসলিম শরিফের বিখ্যাত এই হাদিসে একত্রে উল্লেখ করেছেন:عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: «الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلَاتِ»(সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ২৭৬৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮৯)
আলোচ্য সাতটি মহাপাপ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। একটি আদর্শ ও নিরাপদ সমাজ গঠনে এই পাপগুলো থেকে দূরে থাকা প্রতিটি মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই ধ্বংসাত্মক কাজগুলো পরিহার করে সুন্নাতি জিন্দেগি যাপন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক:মাওলানা মুফতি রায়হান উদ্দিন ঢালী
শিক্ষক(আল কোরআন ও অ্যারাবিক)
অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, লালমাটিয়া, ঢাকা।

