...|...|...

সারাদেশ

কুমিল্লায় ৯ মাসে ১১১ খুন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

টাইমস টুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:০৫ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ১১:০৮
Shares
কুমিল্লায় ৯ মাসে ১১১ খুন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

ছবি: টাইমস টুডে গ্রাফিক্স

কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী, স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যার পর এখন নতুন করে আলোচনায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী খুনের ঘটনা। জেলাজুড়ে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। 

পুলিশের তথ্যই বলছে, বিগত সময়ের চেয়ে অপরাধ বেড়েছে। ২০২৫ সালে পুরো জেলায় খুন হয়েছেন ১০৩ জন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ১৪৪টি। আর গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে জেলায় ১১১টি খুন, ১৩৯টি ধর্ষণ, ২৩২টি নারী-শিশু নির্যাতন, ১৪টি অপহরণ, ৩৬টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া এ সময়ে দাঙ্গা, দস্যুতা, চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধও সংঘটিত হয়েছে। এসব অভিযোগে বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। তবে পুলিশের দাবি,  প্রতিটি ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।  

কুমিল্লার ১৮টি থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৯ মাসে নানা অপরাধে জেলায় চার হাজার ৯৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৪টি খুন, ১৬টি ধর্ষণ, ১৭টি নারী ও শিশু নির্যাতনসহ ৪৯১টি; ফেব্রুয়ারিতে ১২টি খুন, ৮টি ধর্ষণ, ১৯টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৪০৭টি; মার্চে ১১টি খুন, ৯টি ধর্ষণ, ১৮টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৫১৭টি এবং এপ্রিলে ১০টি খুন, ২০টি ধর্ষণ, ২৮টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৫৮৪টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। 

এপ্রিলে অপরাধের মধ্যে আলোচিত ছিল কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা। ২৫ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে মহাসড়কের কুমিল্লার ঝাগুরঝুলি এলাকায় নামার পর তিনি ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিনতাইকারী সোহাগ, এমরান, রাহাত, সুজনকে গ্রেফতার করে। 

মে মাসে সর্বোচ্চ ১৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ১২টি ধর্ষণ, ২৪টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৬১২টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। জুনে সর্বোচ্চ ৪১টি নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে ১০টি খুন, ২১টি ধর্ষণসহ ৫৭৭টি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। জুলাইয়ে ১০টি খুন, ২২টি ধর্ষণ, ৩০টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৫০৯টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আগস্টে ১১টি খুন, ১৭টি ধর্ষণ, ২১টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৫৮৫টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৭ আগস্ট রাতে দেবিদ্বার উপজেলা সদরে ফরিদা ইয়াসমিন নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তার লাশ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হয়।

পরদিন পাশের ডোবা থেকে পলিথিনে মোড়ানো লাশের খণ্ডগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তার ও তার সহযোগী আমির হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, কিশোর অপরাধসহ সমাজে নানামুখী অপরাধ বেড়েছে। অপরাধ অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা যাবে না। পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতীম হত্যা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ কিশোর গ্যাংয়ের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে। তারা অপ্রতীমের আইফোনের জন্য তাকে হত্যা করে। এ মাসে ১৬ খুন, ১৪ ধর্ষণ, ৩৪টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৬৮১টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। 

সর্বশেষ ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বের হয় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী। ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গ্রেফতার সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মিয়া ওই ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, এখন আর গতানুগতিক পদ্ধতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এজন্য রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবতে হবে। তার ভাষ্য, কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। শিশু-কিশোররা যেন মোবাইল ফোনে আসক্ত না হয়, সেজন্য সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মুহাম্মদ বদিউল আলম সুজন সমকালকে বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তে ধীর গতি, একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল, ডাক্তারি পরীক্ষা ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দেরি, সাক্ষী না পাওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট সাক্ষী সময়মতো না পাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। এতে অনেক ভুক্তভোগী ন্যায় বিচার পান না।  

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শারমিন সুলতানা গণমাধ্যমকে বলেন, ডাক্তারি পরীক্ষার ক্ষেত্রে অনেক সময় আলামত নষ্ট হওয়ার পর ভিকটিমকে আনা হয়। বস্ত্রসহ অন্যান্য আলামতও সংরক্ষণ করা হয় না। এতে অনেক সময় ডিএনএ নমুনার পরীক্ষায় ফল আসে না। 

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান সমকালকে বলেন, হত্যা-ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য আমরা (পুলিশ) কম সময়ের মধ্যে বের করতে সক্ষম হয়েছি। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, এসআরবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। কিশোর গ্যাং, মাদকবিরোধীসহ টানা অভিযানে দুই সহস্রাধিক লোককে আটক করা হয়েছে। নানামুখী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।