জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাত নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই রায়ে আওয়ামী লীগের চার নেতা ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলসহ পাঁচ আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের অর্ধেক রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, বাজেয়াপ্ত করা সম্পদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণে ব্যবহার করা হবে।
রায়ে সম্পদ বাজেয়াপ্তের আওতায় থাকা পাঁচজন হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
এর মধ্যে শেখ ফজলে শামস পরশ কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় তার নির্বাচনী হলফনামাভিত্তিক সম্পদের হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় ওবায়দুল কাদের, নাছিম, আরাফাত ও নিখিল তাদের সম্পদের যে বিবরণ দিয়েছিলেন, তা থেকে তাদের ঘোষিত সম্পদের একটি চিত্র পাওয়া যায়।
ওবায়দুল কাদেরের সম্পদ
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ আসনের প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া হলফনামায় ওবায়দুল কাদের নগদ অর্থ দেখিয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমা ছিল প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য বিনিয়োগ মিলিয়ে তাঁর আর্থিক সম্পদের বড় অংশ ছিল এসব খাতে।
হলফনামা অনুযায়ী, তার সঞ্চয়পত্রের পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা। একটি গাড়ির মূল্য দেখানো হয় ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২৫ তোলা সোনার মূল্য দেখানো হয়েছিল দেড় লাখ টাকা।
এ ছাড়া প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আসবাবপত্র থাকার তথ্য দেন তিনি।
সব মিলিয়ে কাদেরের অস্থাবর সম্পদের ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকার উত্তরা এলাকায় ৫ কাঠা জমির কথা উল্লেখ করা হয়। হলফনামায় ওই জমির মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় ৫১ লাখ টাকা।
অর্থাৎ হলফনামায় ওবায়দুল কাদেরের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট ঘোষিত মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
বাহাউদ্দিন নাছিমের সম্পদ
ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনের সময় জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের হাতে নগদ ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল প্রায় ৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও বন্ডে তার বিনিয়োগের মূল্য ছিল প্রায় ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। পাশাপাশি ৬০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং প্রায় ৬৫ লাখ টাকা মূল্যের দুটি গাড়ি ছিল।
২৫ ভরি সোনার মূল্য তিনি প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেখিয়েছিলেন। ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে নাছিমের অস্থাবর সম্পদের ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে মাদারীপুর ও সাভারে ১৩৯ শতাংশ কৃষিজমি এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাজীপুরে ১৫৩ শতাংশ অকৃষিজমির তথ্য রয়েছে। এসব জমির মোট মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
ঢাকার উত্তরায় একটি ভবনের মূল্য দেখানো হয় ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এ ছাড়া মিরপুরে একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৪৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়। হলফনামা অনুযায়ী, নাছিমের মোট স্থাবর সম্পদের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতের সম্পদ
ঢাকা-১৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আরাফাত নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
হলফনামায় তার স্থাবর সম্পদের মধ্যে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য রয়েছে। এর ঘোষিত মূল্য প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অন্য কোনো স্থাবর সম্পদের তথ্য সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
আরাফাতের অস্থাবর সম্পদের বড় অংশ ছিল শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ। নয়টি কোম্পানিতে তার শেয়ার ছিল, যার মোট মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ৩৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, প্রায় ১৭ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি এবং ৩ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী থাকার তথ্য দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে তার নিজের নামে অস্থাবর সম্পদের ঘোষিত মূল্য প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সম্পদ
ঢাকা-১৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন খান নিখিলের হলফনামায় কৃষি ও অকৃষিজমিসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের বিবরণ রয়েছে।
তার একটি কৃষিজমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ একর, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আরেকটি কৃষিজমি ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, যার মূল্য ২৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
এ ছাড়া তিন কাঠার একটি অকৃষি প্লটের মূল্য ৪ লাখ ৭১ হাজার ৬০০ টাকা এবং বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট শ্রেণিতে প্রায় ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬১০ টাকার সম্পদের তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে নিখিলের স্থাবর সম্পদের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
অস্থাবর সম্পদের মধ্যে তার হাতে নগদ ছিল ২৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। নিজের নামে ১ কোটি টাকার একটি এফডিআরও রয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার শেয়ারও রয়েছে। এর মধ্যে নাবিল প্রপার্টিজে ৮ লাখ টাকা এবং নাবিল প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ে ৬২ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে।
তিনটি যানবাহনের ঘোষিত মূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা।
হলফনামায় দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নিখিলের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বাজেয়াপ্ত সম্পদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্বজন এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে ব্যবহার করা হবে। এর আগে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশও দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।


