ইসলামে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, সম্পর্ক নষ্ট এবং শত্রুতা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে চোগলখুরি বলা হয়। এ ধরনের কাজের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে অশান্তি তৈরি হতে পারে। কোরআন ও হাদিসে চোগলখুরির নিন্দা করা হয়েছে এবং এ কাজের জন্য কঠোর শাস্তির সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
চোগলখুরি শুধু মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে না, বরং এটি ব্যক্তির আমল ও পরকালীন পরিণতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অন্যের কথা ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
চোগলখুরি বলতে কী বোঝায়
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা দুজন মানুষের মধ্যে বিরোধ বাধানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে পৌঁছে দেওয়াই চোগলখুরি। এর ফলে মানুষের মধ্যে সন্দেহ, হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা তৈরি হয়।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা জানো চোগলখুরি কী? সাহাবিরা বলল, আল্লাহ ও তার রাসুল তা সঠিকভাবে অবগত। রাসুল (সা.) বলেন, চোগলখুরি হলো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একের কথা অন্যের কাছে লাগানো। (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ, হাদিস : ৮৪৫)
কবরের আজাবের কারণ হতে পারে চোগলখুরি
হাদিসে চোগলখুরিকে কবরের শাস্তির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একবার রাসুল (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে শাস্তি হওয়ার কথা জানান। পরে তিনি একটি খেজুরের ডাল দুই ভাগ করে কবর দুটিতে পুঁতে দেন।
সাহাবায়ে কিরাম (রা.) এর কারণ জানতে চাইলে রাসুল (সা.) তাদের জানান, কবর দুটিতে শাস্তি হচ্ছে। এমন কোনো গুনাহর কারণে তাদের শাস্তি হচ্ছে না, যা থেকে বেঁচে থাকা কঠিন ছিল। একজন প্রস্রাবের ফোঁটা থেকে সতর্ক থাকতেন না, আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াতেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৭২৮)
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, দৈনন্দিন জীবনে সহজে এড়িয়ে চলা সম্ভব-এমন পাপের ক্ষেত্রেও অসতর্কতা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
মিথ্যা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যও রয়েছে শাস্তির সতর্কবার্তা
রাসুল (সা.)-কে একবার স্বপ্নে জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। সেই বর্ণনায় এমন এক ব্যক্তির শাস্তির কথা এসেছে, যে মিথ্যা কথা বলত এবং তার বলা মিথ্যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.)-কে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি-যার কাছে গিয়ে দেখেছেন যে তার মুখের এক ভাগ মাথার পেছন দিক পর্যন্ত, এভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ মাথার পেছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল সে ওই ব্যক্তি, যে সকালে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে এমন মিথ্যা বলে, যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। (বুখারি, হাদিস : ৭০৪৭)
অর্থাৎ, মিথ্যা প্রচার এবং মানুষের মধ্যে অশান্তি ছড়ানোর মতো কাজকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কোরআনে চোগলখুরির নিন্দা
চোগলখুরির মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। একে অন্যের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং ছোট বিরোধও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তির আনুগত্য না করার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে বেশি শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, যে পশ্চাতে নিন্দা করে, একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগায়, তুমি তার আনুগত্য করবে না।’ (সুরা : কালাম, আয়াত : ১০-১১)
এই আয়াতে পরনিন্দা ও চোগলখুরির মতো আচরণ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। তাই অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনা কিংবা কারও ব্যক্তিগত কথা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন মুসলমানের দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
চোগলখোরের জন্য জান্নাত নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা
চোগলখুরির পরিণতি সম্পর্কে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। রাসুল (সা.) বলেন, চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (বুখারি, হাদিস : ৫৭০৯; মুসলিম, হাদিস : ১০৫)
হাদিসের এই সতর্কবার্তা চোগলখুরির ভয়াবহতা তুলে ধরে। মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা ইসলামে গুরুতর অন্যায় হিসেবে বিবেচিত।


