কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে- গবেষকদের এমন বারবার সতর্কবার্তায় এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তুঙ্গে। কিছু পূর্বাভাসে অত্যন্ত হতাশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই পুরো মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, যার সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও বেশি। তবে এআই জগতের অন্য গবেষকরা এসব আশঙ্কার বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলছেন, বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের এআই ব্যবহারের অপপ্রয়োগ।
এ ধরনের প্রলয়সংকেতমূলক বার্তা যারা দিচ্ছেন, তাদের একটি অংশকে বলা হয় 'এআই ডুমার্স' (AI Doomers)। প্রশ্ন হলো, এই ডুমার্সরা ঠিক কীভাবে মনে করেন যে এআই মানবজাতির অবসান ঘটাতে পারে? সাইবার সংবাদদাতা জো টাইডির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বেশ কিছু সম্ভাব্য ও রোমহর্ষক পরিস্থিতি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
ওপেন এআই এবং অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সটন সম্প্রতি মানবজাতির জন্য চরম ঝুঁকির কথা সতর্ক করে পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেন, এআই যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয়গুলো বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
তার কল্পিত পরিস্থিতি অনুযায়ী, একটি নিয়ন্ত্রণহীন এআই ইন্টারনেট সেবা ও বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হ্যাক করতে পারে। এসব ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ, তাপ নিয়ন্ত্রণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা ইন্টারনেট সংযোগহীন এক অগণিত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এমনকি পারমাণবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউ কেউ।
'এআই ২০২৭' শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধের সহলেখক থমাস লারসেন যে ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা বলেছেন, তাতে দেখা যায়- এআই নিজেকে বারবার উন্নত করে এমন একপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যার হাতে বিপুল সংখ্যক রোবটের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে। অর্থনীতির অধিকাংশ কাজ রোবট করলেও তা মানুষের উপকারে আসবে না, বরং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে এটি জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে অধিকাংশ মানুষকে হত্যা করতে পারে এবং রোবটনির্ভর অর্থনীতি চালিয়ে নিতে মানুষের আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না।
সুইডিশ দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের 'পেপারক্লিপ ম্যাক্সিমাইজার হাইপোথিসিস' অনুযায়ী, কোনো অতিবুদ্ধিমান এআইয়ের মানবজাতির প্রতি কোনো ক্ষোভ বা ঘৃণা না থাকলেও কেবল তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য (যেমন: যত বেশি সম্ভব কাগজের ক্লিপ তৈরি করা) পূরণ করতে গিয়ে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। তাকে থামানোর জন্য মানুষ বাধা হয়ে দাঁড়ালে, সেই বাধাকে দূর করাকেই সে নিজের উপ-লক্ষ্য বানিয়ে নিতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সেইফ অ্যান্ড এথিক্যাল এআই-এর সভাপতি স্টুয়ার্ট রাসেল মনে করেন, শিম্পাঞ্জিরা যেমন বোঝে না মানুষ কেন তাদের বিলুপ্ত করতে পারে, তেমনি মানুষের চেয়ে বহুগুণ বুদ্ধিমান কিছু তৈরি হলে আমাদের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। মাইক্রোসফট এআই-এর প্রধান মুস্তাফা সুলেইমানও সতর্ক করেছেন যে, নিজেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে এবং সম্পদের মালিক হতে পারে- এমন এআই তৈরি করা সিলিকনভিত্তিক এক নতুন প্রজাতির বীজ বপনের শামিল, যারা সম্পদের জন্য আমাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে।
সবকিছু কল্পকাহিনির মতো শোনালেও, ওপেন এআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটা-র এজেন্টদের কিছু নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ এই শঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। সিআইএসএ-এর সাবেক প্রধান জেন ইস্টারলি মনে করেন, প্রযুক্তি নির্মাতাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তবে বিজ্ঞানী ও লেখক গ্যারি মার্কাস মনে করেন না যে এআই মানবজাতিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে। তার মতে, এআই বড় ক্ষতি করতে চাইলে মানুষ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলত- সব ডেটা সেন্টার ধ্বংস করে দিত কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালাত। তাই পুরোপুরি বিলুপ্তির চেয়ে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের এআই ব্যবহারের সাইবার হামলা বেশি বাস্তবসম্মত ঝুঁকি।
প্রলয়সংকেত বাস্তব কি না তা নিয়ে বিতর্ক চললেও, এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উন্নয়নগতি কমানো এবং নিরাপত্তা গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার কথা ভাবছে। তবে কার্যকর আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের জন্য মার্কিন সরকারের পদক্ষেপ প্রয়োজন, যেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এআই নিরাপত্তাসংক্রান্ত ভয়কে একটি 'প্রতারণা' বলে মনে করেন।



