...|...|...

সারাদেশ

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার বর্ণনা

উদ্ধারের সময় স্ত্রীকে জড়িয়ে রেখেছিলেন স্বামী, হাতে ছিল শিশু সন্তান

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:০৫
Shares
উদ্ধারের সময় স্ত্রীকে জড়িয়ে রেখেছিলেন স্বামী, হাতে ছিল শিশু সন্তান

টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পরের ঘটনা বর্ণনা করেন ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা লাশগুলোর মধ্যে হৃদয়বিদারক একটি দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পুরুষের লাশের পাশে নারী ও শিশুর লাশ পাওয়া যায়। পুরুষটি নারীকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন, আর নারী আগলে রেখেছিলেন শিশুটিকে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা একই পরিবারের সদস্য। তবে আগুনে লাশগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দোলন আচার্য উদ্ধারকাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, একটি কক্ষ থেকে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুনে ওই কক্ষের সবকিছু পুড়ে যাওয়ায় লাশগুলো মারাত্মকভাবে বিকৃত হয়ে গেছে। কয়েকটি লাশ এতটাই পুড়ে গেছে যে, সেগুলো শিশু নাকি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির, তা বোঝা কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে শুধু পায়ের অংশ দেখা গেছে। এ অবস্থায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

দোলন আচার্য জানান, কক্ষটির পাশের একটি শৌচাগার থেকে প্রথমে একজন পুরুষের লাশ পাওয়া যায়। পরে আশপাশের অংশে তল্লাশি চালিয়ে আরও লাশের সন্ধান মেলে। ভবনটির তৃতীয় তলায় পৌঁছে দেখা যায়, পুরো কাঠামো ধসে পড়েছে। শুধু পাকা স্তম্ভগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। টাইলস করা একটি শৌচাগারের অংশ তুলনামূলক অক্ষত থাকায় সেখানে লাশগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, তৃতীয় তলায় প্রথমে একটি লাশ চোখে পড়ে। পরে আরও ওপরে গিয়ে একই জায়গায় চারজনের লাশ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন শিশু, দুজন নারী ও একজন পুরুষ ছিলেন। পুরুষটি একজন নারীকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন। ওই নারীও শিশুটিকে আগলে রেখেছিলেন। তাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের কাছাকাছি আরেক নারীর লাশও পাওয়া যায়।

উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মধ্যে কয়েকটি তুলনামূলক কম পুড়লেও পরিচয় নিশ্চিত করার মতো অবস্থা নেই। আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

দোলন আচার্য আরও বলেন, একটি পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ থাকার তথ্যের সাথে উদ্ধার হওয়া লাশগুলোর মিল থাকতে পারে। ওই পরিবারে একটি বড় শিশু ও একটি ছোট শিশু রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে লাশগুলো নিখোঁজ ওই পরিবারের সদস্যদেরই কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। লাশগুলোর অবস্থা এবং ভবনের ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক পথে নামানো সম্ভব না হওয়ায় রশির সাহায্যে লাশগুলো নিচে নামাতে হয়েছে।

কাঠ ও বাঁশের সিঁড়ি পুড়ে বন্ধ হয়ে যায় বের হওয়ার পথ

অগ্নিকাণ্ডে ভবনটির কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান দোলন আচার্য। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিচতলার রেস্তোরাঁ অংশের মেঝে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ভবনের পেছনের নিচতলায় ছিল রান্নাঘর। সেখানে কিছু দেয়াল থাকলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার বড় অংশ কাঠের বোর্ড দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। পাকা স্তম্ভ ছাড়া ভবনের অন্যান্য অংশের বেশির ভাগই ছিল বোর্ডনির্ভর।

আগুন লাগার পর কাঠ ও বাঁশের তৈরি সিঁড়িগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ওপরের তলায় থাকা লোকজনের নিচে নামার পথ বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকটি শিশু লাফ দিয়ে পাশের কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিল বলে জানা গেছে। দুর্বল কাঠামোর কারণে ভবনের ওপরের তলায় অবস্থানকারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তিনি জানান, তৃতীয় তলার শৌচাগার ছাড়া অন্য কোথাও আর কোনো লাশ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পুরো এলাকা পুনরায় পরীক্ষা করা হয়েছে। শৌচাগারটির টাইলস করা অংশ তুলনামূলক শক্ত থাকায় সেটি টিকে ছিল। ভবনের বাকি অংশ পুড়ে যাওয়া ও ধসে পড়ায় তল্লাশি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

দোলন আচার্যের মতে, ভবনটির সিঁড়ি নির্মাণে শক্ত স্টিলের কাঠামো ব্যবহার করা হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু কাঠ ও বাঁশের সিঁড়ি আগুনে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ওপরের তলায় থাকা ব্যক্তিদের বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তৃতীয় তলার পেছনে কাচের জানালাও ছিল। তবে সেখান দিয়ে কেউ বের হতে পেরেছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় মোট ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় জানা গেছে, তারা হলেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ, নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাফিস তেহামী, জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।

আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। তাদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানা গেছে।