...|...|...

সারাদেশ

পর্যটকদের ফেলে মালিকের পোষা কুকুর-বিড়াল উদ্ধারে ব্যস্ত ছিলেন টুপটুপ রিসোর্টকর্মীরা

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৪৯
Shares
পর্যটকদের ফেলে মালিকের পোষা কুকুর-বিড়াল উদ্ধারে ব্যস্ত ছিলেন টুপটুপ রিসোর্টকর্মীরা

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিপদের মুহূর্তে তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়াই ছিল রিসোর্টকর্মীদের দায়িত্ব। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় কয়েকজন কর্মী পর্যটকদের সতর্ক করা বা উদ্ধারের পরিবর্তে মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। অথচ তখনো কয়েকজন পর্যটক কক্ষে আটকা ছিলেন। অভিযোগটি সত্য হলে তা কর্মীদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে রান্নাঘরের গ্যাসের চুলায় চা বসিয়ে এক কর্মী ঘুমিয়ে পড়েন বলে জানা গেছে। কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর রিসোর্টটির বিভিন্ন অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ১০ পর্যটকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ চলে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও যশোরের একই পরিবারের চার সদস্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও রিসোর্টকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগুন লাগার পর রিসোর্টের ১৯ জন কর্মী একে একে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তাদের সাথে ছিল মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল। তবে কর্মীরা পর্যটকদের সতর্ক করতে এবং কক্ষে আটকে পড়া অতিথিদের উদ্ধারে কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রিসোর্টটির কাছেই বসতঘর এক প্রত্যক্ষদর্শী যুবক শাহ আলম। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে দেখেন, রিসোর্টটি জ্বলছে। তখন কয়েকজন কর্মী মালিকের পোষা কুকুর ও বিড়ালগুলোকে বাঁচাতে ছোটাছুটি করছিলেন। রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে তিনি একাধিকবার কুকুর নিয়ে সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে দেখেছেন বলেও জানান।

প্রত্যক্ষদর্শীর এই বক্তব্য আগুন লাগার মুহূর্তে কর্মীদের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে ঘটনার পূর্ণ চিত্র জানতে কর্মীদের বক্তব্য এবং উদ্ধারকাজে তাদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।

রিসোর্টে আগুন লাগলে অতিথিদের দ্রুত সতর্ক করা, নিরাপদে বেরিয়ে যেতে সহায়তা করা এবং কেউ আটকা পড়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার প্রস্তুতি কতটা ছিল, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম পর্যাপ্ত ছিল কি না এবং জরুরি বহির্গমনপথ ব্যবহারযোগ্য ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সাথে রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় চা বসিয়ে কর্মীর ঘুমিয়ে পড়ার তথ্য এবং আগুনের সূত্রপাতের কারণও বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে এক নম্বর আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখসহ মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মামলা হয়েছে। মামলার বাদী পুলিশ। রিসোর্ট পরিচালনায় কার কী দায়িত্ব ছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থায় অবহেলা ছিল কি না এবং সেই অবহেলার সাথে প্রাণহানির সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি কর্মীদের দায়িত্ব বণ্টন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পোষা প্রাণীর জীবন রক্ষার চেষ্টা অন্যায় নয়। কিন্তু আগুনের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রিসোর্টকর্মীদের প্রধান দায়িত্ব। কোনো কর্মী জেনেশুনে বিপদে থাকা পর্যটকদের উপেক্ষা করে অন্য কাজে মনোযোগ দিয়ে থাকলে, তার ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

১০ পর্যটকের মৃত্যু এবং একই পরিবারের চার সদস্যের সন্ধান না পাওয়ার ঘটনায় আগুনের কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা খুঁজে বের করা জরুরি। আগুন লাগার মুহূর্তে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করা হয়েছিল এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা থাকলে তার দায় কার, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে।