বাংলাদেশের ইলিশ গুজরাটে চলে যাচ্ছে কিনা এবং কেন সাগর ঘুরে চাঁদপুরে কম আসছে, এই তথ্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ।
শনিবার (৩ অক্টোবর) এক সাক্ষাৎকারে এসবের তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেন তিনি।
ড. তায়েফা আহমেদ বলেন, ‘বাস্তবিক অর্থে আমাদের দেশীয় ইলিশ সাগর ঘুরে চাঁদপুরে না এসে ডিম না ছেড়ে গুজরাটে যাওয়ার কথা না। আমরা এখনো আশাবাদী, আমরা যদি আমাদের নদীগুলোকে রক্ষা করতে পারি, অবৈধ জাল দিয়ে ইলিশ আহরণ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারি, তাহলে আমাদের ইলিশ আমাদেরই থেকে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের নদ-নদীতেই আবার সমুদ্র থেকে ইলিশ এসে ডিম ছাড়বে, বড় হবে এবং এসব নদ-নদীতে আশানুরূপ ইলিশ পাবো বলে আশাবাদী।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মা ইলিশের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত সময় নির্ধারন করতে যাচাই-বাচাই করতে হয়। এবারো ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য আমাদের ৫টি টিম নানা স্থানে গবেষনা চালিয়েছে। কিন্তু ইলিশের পেটে ডিম থাকলেও তা আমাদের বেধে দেওয়া ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবরের ২২ দিনের আগে বা পরের ১০ দিন ডিম ছাড়বে তা মনে হয়নি।’
ড. তায়েফা আহমেদ বলেন, ‘উজান থেকে নভেম্বরে আসা পানির স্রোত কমে যায়। তবে শীতে পানি ঠান্ডা থাকে। বৃষ্টিপাত কমে যায়। এগুলো ইলিশের ডিম ছাড়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নভেম্বরের প্রাক্কালেই ইলিশের ডিম ছাড়ার আদর্শ সময় বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। ঠিকভাবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশ গুজরাটে নয় বরং দেশেই থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন ইলিশ নিয়ে সরাসরি একটি প্রকল্পে কাজ করছি। যার নাম পপুলেশন ডিনামিক্স এন্ড স্টক এসিসমেন্ট অব টেনুআলুছা ইলিশা ইন বাংলাদেশ। এটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে শুরু হলেও ২০৩০ এর জুন পর্যন্ত চলবে। যার আনুমানিক বাৎসরিক ব্যায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা।’
তিনি জানান, এই প্রকল্পে ইলিশের আকার, দৈর্ঘ্য ও ওজন নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। দেশের কোন এলাকায় কোন ধরনের ইলিশের প্রাচুর্যতা বেশি। কোন সাইজের মাছটা আহরণ করা উচিত সেটা দেখা হবে এতে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে ২৫ সেন্টিমিটার সাইজের নীচে ইলিশ ধরা নিষেধ ছিলো, যেটাকে আমরা জাটকা বলি। এখন সেই সাইজটা কি ওটাই থাকবে, নাকি বাড়াতে কমাতে হবে। সেটা আমরা সরকারকে এ গবেষনা থেকে জানাবো।’
তিনি বলেন, ‘ইলিশের প্রাপ্যতা কোন এলাকায় কম বা বেশি সেটা জানতে পারবো। ইলিশের বংশ নির্বংশ যাতে না হয় সেজন্য কতটুকু ইলিশ আহরণ করা যেতে পারে সেটাও এ গবেষনায় দেখবো। তাতেই ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ দাম হাতের নাগালে আনতে সহায়ক হবে।’
এদিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর আমদানিকারকদের দেওয়া ১০৩টি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বাতিল করে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ জুলাই থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৫৫৩ টন ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারি অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএফএ) এর সাধারণ সম্পাদক শেখ আবিদ হোসেন বলেন, ‘আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার পরও অবৈধ পথে গুজরাটের ইলিশ এখনো বাংলাদেশের বাজারে ঢুকছে। কয়েকদিন আগেও সুন্দরবন সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রায় ৭৫ টন ইলিশ মাছ আমাদের উপকূলে পৌঁছেছে। তবে ঠিক কবে থেকে গুজরাটের ইলিশ বাজারে আসতে শুরু করেছে, তা কেউ নিশ্চিত নই।’
চাঁদপুর বড়ষ্টেশন মাছঘাটের মৎস্য বনিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত বলেন, ‘দেশের সাগর এবং ভারতের সাগর একই। কাজেই এ দেশের ইলিশ গুজরাটে নয়, বরং গুজরাটের কিছু ইলিশ দেশে ঢুকেছে। কিন্তু ওদের মাছ ডিময়ালা মাছ এবং কোয়ালিটি ভালো না।’
তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে ইলিশটা আসতে প্যাকেজিংসহ পোর্টের কাজ শেষ করতে ৫-৬ দিন সময় লাগে। এতে মাছ ভালো থাকেনা বলে সরকার এটা বন্ধ করে দিছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে মাছ কম, বাজার ভালো হওয়ায় গুজরাট থেকে কিছু ঢুকে পড়েছিলো। ওদের কিছু মাছ ডিমের কারনে বিক্রি হয়েছে। কিন্তু স্বাদের জন্য এ দেশের ইলিশ মাছের সাথে কোন ইলিশ মাছই টিকবে না।’


