ঋণের বোঝা মানুষের মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নিতে পারে। সংসারের খরচ মেটানো কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধ করতে গিয়ে অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ইসলামে ঋণ পরিশোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঋণের বোঝা, দুশ্চিন্তা ও অভাব থেকে মুক্তির জন্য পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বিভিন্ন দোয়া ও আমলের কথা উল্লেখ রয়েছে।
ইসলামী শিক্ষায় ঋণমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি হালাল উপার্জন, ঋণ পরিশোধের আন্তরিক সংকল্প এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে ঋণমুক্তির জন্য যেসব দোয়া ও আমলের কথা জানা প্রয়োজন, সেগুলো তুলে ধরা হলো।
১. তওবা ও ইস্তিগফার করা
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং নিয়মিত ইস্তিগফার করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআনে সূরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি প্রচুর বৃষ্টিপাতের ব্যবস্থা করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন।
এই আয়াতগুলোতে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনার সাথে নেয়ামত ও রিজিক বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের উচিত আন্তরিকভাবে তওবা করা, নিয়মিত ইস্তিগফার করা এবং আল্লাহর রহমত কামনা করা।
২. ঋণমুক্তির জন্য বিশেষ দোয়া
ঋণ পরিশোধ ও হালাল রিজিকের জন্য হাদিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। হজরত আলী (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়া শিখিয়েছিলেন বলে তিরমিজির একটি বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
দোয়াটি হলো:
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: হে আল্লাহ! হারামের পরিবর্তে তোমার হালাল রিজিক আমার জন্য যথেষ্ট করো এবং তোমার অনুগ্রহ দিয়ে তুমি ছাড়া অন্য সবার থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দাও।
এই দোয়ার মাধ্যমে হালাল উপার্জনে তৃপ্তি, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল থাকার প্রার্থনা করা হয়।
৩. দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির দোয়া
দুশ্চিন্তা, অক্ষমতা, অলসতা ও ঋণের চাপ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি দোয়া শিখিয়েছেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, মসজিদে আবু উমামাহ নামের এক আনসারি সাহাবিকে চিন্তিত অবস্থায় দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সকাল-সন্ধ্যা এই দোয়া পড়তে বলেন।
দোয়াটি হলো:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজানি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল আজজি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজুবিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি দুশ্চিন্তা ও শোক থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, ভীরুতা ও কৃপণতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রাবল্য (চাপ) থেকে।
দুশ্চিন্তা ও ঋণের চাপ থেকে মুক্তি কামনায় এই দোয়া পাঠ করা যায়। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করাও জরুরি।
৪. নামাজ আদায় ও তাকওয়া অবলম্বন
নিয়মিত নামাজ আদায় এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে জীবন পরিচালনা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পবিত্র কোরআনের সূরা তালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহকে ভয় করে চলা ব্যক্তির জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেওয়া এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আয়াতে বলা হয়েছে, “আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”
তাই বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং ইসলামের বিধান মেনে চলার পাশাপাশি হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
৫. ঋণ পরিশোধের দৃঢ় সংকল্প রাখা
ইসলামে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব রয়েছে। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্যের মর্ম হলো, যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ পরিশোধের নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। আর যে তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।
এ শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, ঋণ নেওয়ার সময় তা পরিশোধের আন্তরিক ইচ্ছা থাকা জরুরি। ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য অর্জনে চেষ্টা করা, পাওনাদারের অধিকার রক্ষা করা এবং সুযোগ অনুযায়ী কিস্তি বা পরিশোধের পরিকল্পনা করা উচিত।
দোয়ার পাশাপাশি বাস্তব উদ্যোগও জরুরি
ঋণমুক্তির জন্য দোয়া ও ইবাদতের পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। হালাল উপার্জনের চেষ্টা, মিতব্যয়িতা ও দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনা ঋণের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে দোয়া করার পাশাপাশি নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আন্তরিক নিয়ত, সৎ উপার্জন ও নিয়মিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের পথে এগিয়ে যাওয়াই একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

