মরুভূমির অসীম নীরবতায় কেউ অপেক্ষা করে, কেউ স্বপ্ন দেখে, আর কেউ ভালোবেসেও প্রিয় মানুষটিকে নিজের কাছে আটকে রাখে না। পাওলো কোয়েলহোর ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’-এর ফাতিমা ঠিক এমনই এক চরিত্র—যার ভালোবাসায় অধিকার কম, বিশ্বাস বেশি; কাছে টানার চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেওয়াই যেন তার প্রেমের ভাষা।
সেই ফাতিমাই এবার মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠছেন তরুণ অভিনয়শিল্পী সায়রা জাহানের অভিনয়ে। আর এই চরিত্র দিয়েই থিয়েটারের জগতে প্রথম পদচিহ্ন রাখতে যাচ্ছেন তিনি।
পাওলো কোয়েলহোর বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’-এর স্বপ্ন, আত্ম-অন্বেষণ, ভালোবাসা ও নিয়তির গল্প মঞ্চে নিয়ে আসছে থিয়েটার দল ‘অ্যাক্টোম্যানিয়া’। নাটকটির নির্দেশনায় রয়েছেন তালহা জুবায়ের। প্রযোজনাটির আবেগঘন অন্যতম চরিত্র ফাতিমা, যার উপস্থিতি সান্তিয়াগোর দীর্ঘ যাত্রায় এনে দেয় এক অন্যরকম কোমলতা।
মরুদ্যানে সান্তিয়াগোর সঙ্গে পরিচয় ফাতিমার। ধীরে ধীরে সেই পরিচয় রূপ নেয় ভালোবাসায়। কিন্তু এই ভালোবাসা কোনো শেকল নয়। সান্তিয়াগো যখন নিজের স্বপ্নের পথে আবারও যাত্রা করতে চায়, ফাতিমা তাকে থামান না। বরং অপেক্ষা বেছে নেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষকে বেঁধে রাখে না, তার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে সাহস দেয়।
এই নীরব অথচ গভীর আবেগের চরিত্রই সায়রার জন্য হয়ে উঠেছে প্রথম মঞ্চাভিনয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ফাতিমার অনেক অনুভূতি সংলাপে নয়, ফুটে ওঠে চোখে, অপেক্ষায়, থেমে থাকা মুহূর্তে। সেই নীরবতার ভেতরের ভালোবাসা ও শক্তিকে মঞ্চে তুলে ধরতে কয়েক মাস ধরে ওয়ার্কশপ, রিহার্সাল ও চরিত্র বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন সায়রা।
সায়রা বলেন, ‘ফাতিমা চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলা আমার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং আনন্দের বিষয়। সে শুধু সান্তিয়াগোর ভালোবাসার মানুষ নয়, সে নিজেই সাহারার এক অখণ্ড অংশ। তার চোখে অপেক্ষা আছে, কিন্তু কোনো আক্ষেপ নেই। প্রথম মঞ্চ প্রযোজনাতেই এমন একটি গভীর চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।’
সায়রার কাছে এই প্রযোজনা শুধু একটি চরিত্রে অভিনয় নয়, বরং নিজের অভিনয়জীবনের প্রথম দরজা খুলে দেওয়ার গল্প। প্রথমবার মঞ্চে উঠছেন, তাই উত্তেজনার সঙ্গে আছে এক ধরনের ভয়ও। তবে সেই ভয়কে ছাপিয়ে সায়রার কাছে বড় হয়ে উঠেছে ফাতিমার অনুভূতিগুলোকে সত্যি করে তোলার চেষ্টা। চরিত্রটির সংযম, অপেক্ষা আর নিঃশব্দ ভালোবাসার শক্তিকে নিজের ভেতরে ধারণ করেই মঞ্চে দাঁড়াতে চান তিনি।
‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’-এর মরুভূমিকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলতে আলো, সংগীত, কোরিওগ্রাফি ও দেহভঙ্গির সমন্বয়ে এক ভিন্ন আবহ তৈরির চেষ্টা করেছে অ্যাক্টোম্যানিয়া। কয়েক মাসের ওয়ার্কশপ, রিহার্সাল ও চরিত্র বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে শিল্পীদের প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে সান্তিয়াগোর স্বপ্নের যাত্রার পাশাপাশি ফাতিমার অপেক্ষাও হয়ে উঠবে গল্পের এক নীরব সুর।
তালহা জুবায়েরের নির্দেশনায় নাটকটিতে সান্তিয়াগো চরিত্রে অভিনয় করছেন সায়েম সিজান। আলকেমিস্ট চরিত্রে আছেন শশাঙ্ক সাহা ও কামরুজ্জামান তাপু। মেলচিজেডেক চরিত্রে মাহফুজ ইসলাম মেঘ, ফাতিমা চরিত্রে সায়রা আকতার জাহান ও ফাতেমা তাবাসসুম ইলমা, স্ফটিক দোকানি চরিত্রে জয়ব্রত বিশ্বাস ও ফকির বিপ্লব, ইংলিশম্যান চরিত্রে সালাউদ্দিন ইভান, জিপসি চরিত্রে মাহবুবা আফরোজ মৌ এবং কাফেলা সর্দার চরিত্রে অভিনয় করছেন কামরুল তিহান।
প্রযোজনাটির আলোক পরিকল্পনায় রয়েছেন মুখলেসুর রহমান, সংগীত পরিকল্পনায় গোপী দেবনাথ, পোশাক ও দ্রব্যসামগ্রী পরিকল্পনায় রেহনুমা তাবাসসুম, দেহবিন্যাসে ফরহাদ আহমেদ শামীম এবং রূপসজ্জায় শুভাশীষ দত্ত তন্ময়।
‘অ্যাক্টোম্যানিয়া’র সদস্যদের প্রত্যাশা, দর্শক যেন শুধু সান্টিয়াগোর মরুভূমির যাত্রাই না দেখেন; বরং নিজের স্বপ্ন, অন্তর্দৃষ্টি ও জীবনের ‘পার্সোনাল লিজেন্ড’ বা ব্যক্তিগত গন্তব্যকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করার অনুপ্রেরণা পান।

