গাড়িপ্রেমীদের কাছে ফেরারি মানেই গতি, বিলাসিতা আর ঐতিহ্যবাহী পেট্রোল ইঞ্জিনের গর্জন। কিন্তু সেই ধারায় এবার বড় এক পরিবর্তন এনেছে ইতালীয় প্রতিষ্ঠানটি - বাজারে এনেছে তাদের প্রথম সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি, নাম যার ‘লুচে’।
আর সেই গাড়িরই একটি বিশেষ সংস্করণ নিলামে বিক্রি হয়েছে চোখ কপালে তোলা দামে- প্রায় সাড়ে চার কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৯২ কোটি টাকার সমান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের মাধ্যমে জানা গেছে, এই বিক্রি এখন পর্যন্ত নিলামে বিক্রি হওয়া কোনো নতুন গাড়ির সর্বোচ্চ দামের রেকর্ড গড়েছে।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার মন্টেরিতে অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত গাড়ি উৎসব ‘মন্টেরি কার উইক’ যেখানে প্রতি বছর দুর্লভ ও সংগ্রহযোগ্য গাড়ি নিয়ে বসে জমজমাট নিলাম। এই উৎসবেই দাতব্য নিলামে ওঠে লুচের বিশেষ সংস্করণ ‘চ্যাসিস জিরো’- অর্থাৎ মডেলটির একদম প্রথম চ্যাসিস।
নিলাম শুরুর আগে গাড়িটির দাম অনুমান করা হয়েছিল মাত্র ১১ লাখ ডলার। কিন্তু নিলাম শুরু হতেই একের পর এক ক্রেতা দর হাঁকাতে থাকেন, আর শেষমেশ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রেতা গাড়িটি কিনে নেন প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে প্রায় ৩৬ গুণ বেশি দামে- ৪ কোটি ডলারে। নিলাম প্রতিষ্ঠান আরএম সোথবি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ফেরারি ইউএসএ তাদের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছে, একের পর এক দর হাঁকানোর পর যেন সরাসরি ইতিহাসই তৈরি হয়ে গেল।
ফেরারি মানেই সাধারণত কৌণিক, তীক্ষ্ণ আর আক্রমণাত্মক ডিজাইন। কিন্তু লুচের ডিজাইন সেই চিরচেনা ছাঁচ থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এর আকৃতিকে তুলনা করা হয়েছে একটি ‘বুদবুদ’- এর সাথে।
এই ভিন্নধর্মী চেহারার তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর ফেরারির অনেক দীর্ঘদিনের ভক্তই হতাশা প্রকাশ করেছিলেন এবং নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠানটি নিজেরাই বলছে, এটি তাদের জন্য ‘ভিন্নধর্মী ক্রেতাদের জন্য ভিন্নধর্মী এক মডেল।’
নিলামে বিক্রি হওয়া ‘চ্যাসিস জিরো’ গাড়িটিতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ধরনের আধা-চকচকে, মুক্তার মতো ফিনিশিং। এই বিশেষ প্রলেপের কারণে আলোর তীব্রতা ও কোণের ওপর ভিত্তি করে গাড়ির গায়ের রং বদলে যায় - কখনো সবুজাভ, আবার কখনো বেগুনি আভা ফুটে ওঠে।
গাড়ির অভ্যন্তরেও রাখা হয়েছে বিশেষ নজর। ব্যবহার করা হয়েছে ‘পার্লা লে মানস’ নামের ধাতব চামড়ার আসনসজ্জা, যেখানে সাদা পটভূমির ওপর ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্বতন্ত্র কালো নকশা।
চার চাকায় চারটি আলাদা বৈদ্যুতিক মোটর জুড়ে দেওয়া হয়েছে গাড়িটিতে। ইতালীয় ভাষায় ‘লুচে’ শব্দের অর্থ ‘আলো’- যা এই বৈদ্যুতিক মডেলের নামকরণের পেছনের ভাবনাকেও যেন প্রতিফলিত করে।
ফেরারি জানিয়েছে, নিলাম থেকে পাওয়া পুরো অর্থ দেওয়া হবে দ্য ফেরারি ফাউন্ডেশনে, যা বিভিন্ন শিক্ষামূলক উদ্যোগে ব্যয় হবে।
নিলাম শেষে গাড়িটি সাময়িকভাবে ফিরিয়ে নেওয়া হবে উত্তর ইতালির মারানেলো শহরে, যেখানে এটি তৈরি হয়েছিল। এরপর ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে গাড়িটি তুলে দেওয়া হবে সেই রহস্যময় ক্রেতার হাতে।
শুধু বিশেষ সংস্করণ নয়, সাধারণ ক্রেতাদের জন্যও লুচে বাজারে আসছে শীঘ্রই। চলতি বছরের শেষ তিন মাসে (চতুর্থ ত্রৈমাসিকে) সাধারণ গ্রাহকদের কাছে গাড়িটি ডেলিভারি দেওয়া শুরু হবে।
এই সংস্করণের দাম রাখা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার ইউরো, যা প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের সমান।
অর্থাৎ, ফেরারির বৈদ্যুতিক যুগের যাত্রা শুরু হলো এক রেকর্ড গড়া নিলাম দিয়েই - বিতর্ক, বিস্ময় আর ইতিহাস, সবকিছু মিলিয়েই।


