মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হাতে মাটি তুলে নিয়েছিলেন কিশোর কুমার বিশ্বাস। সেই মাটি দিয়েই শুরু হয়েছিল দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরির হাতেখড়ি। এরপর পেরিয়ে গেছে ৩৬ বছর। এখন ৪১ বছর বয়সেও মাটির সাথে তার সেই সম্পর্ক অটুট। দেবী দুর্গার প্রতি ভালোবাসা আর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে প্রতিমা গড়েই চলছে তার জীবন-জীবিকা।
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার খরমখালী এলাকার শেরেবাংলা রোডের বাসিন্দা কিশোর কুমার বিশ্বাস। তিনি প্রয়াত কালিদাস বিশ্বাসের ছেলে। বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। বর্তমানে সন্তানকে নিয়ে ছোট্ট সংসার তার। একসময় চাকরি করলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিমা তৈরির পেশাকেই জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর একটি ব্যাংকে চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন কিশোর। পরে এনজিও রেনেসাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তবে চাকরির পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজও চালিয়ে যান। মাটির এই শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও টান থেকেই একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি প্রতিমা তৈরির পেশায় যুক্ত হন তিনি।
ভাস্কর কিশোর কুমার বিশ্বাস বলেন, আমি ৩৬ বছর ধরে প্রতিমা তৈরি করি। পাঁচ বছর বয়স থেকেই এই কাজ শুরু করেছি। দেবী দুর্গাকে ভালোবাসি, তাই এই কাজের প্রতি আমার আলাদা একটা টান আছে। চাকরি করেছি, কিন্তু পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজও চালিয়ে গেছি। এখন এটাই আমার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন কিশোর। তার সাথে কাজ করছেন আরও তিন ভাই। চারজন মিলে প্রায় তিন মাস ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এ বছর কিছুটা দেরিতে কাজ শুরু করায় বেড়েছে কাজের চাপ।
তিনি বলেন, গত বছর এখানে ১৮১টি প্রতিমা তৈরি হয়েছিল। এবার ২০১টি প্রতিমা হবে। প্রায় তিন মাস ধরে কাজ করছি। আমার সাথে আরও তিন ভাই আছে। আমরা চারজন মিলে কাজ করছি। আরও প্রায় এক মাস পর কাজ শেষ হবে।
একটি প্রতিমা তৈরিতে ন্যূনতম এক সপ্তাহ সময় লাগে জানিয়ে তিনি বলেন,এ বছর নতুন আঙ্গিকে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। আমি একটু দেরিতে কাজে এসেছি, তাই কাজের চাপও বেশি। অনেকগুলো প্রতিমা তৈরি করতে হচ্ছে। প্রতিটি প্রতিমার কাজ শেষ করতে অনেক সময় লাগে।
তিনি আরোও বলেন,এবারের প্রতিমায় থাকছে বৈচিত্র্যও। দেবী দুর্গার পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে বড় আকারের লোকনাথের প্রতিমা। এর পাশেই তৈরি হচ্ছে কল্কি অবতারের প্রতিমা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কল্কি অবতারকে কলিযুগের শেষ অবতার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দিনের আলো ফোটার সাথে শুরু হয় কিশোরের কর্মব্যস্ততা। বাঁশ, খড়, মাটি ও রং নিয়ে দিনের পর দিন চলে তার কাজ। কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে মাটি দেওয়া, শুকানো, মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলা ও রং-তুলির শেষ আঁচড়-প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য ও সময়।
স্থানীয় বাসিন্দা পূজা দাস বলেন,কিশোর কুমার বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। তার তৈরি প্রতিমায় ভিন্নতা থাকে। পূজা সামনে রেখে এখন দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা অরুপ বলেন,ছোটবেলা থেকেই কিশোরকে প্রতিমা তৈরির সাথে যুক্ত থাকতে দেখেছি। বছরের পর বছর ধরে তিনি এই কাজ করে আসছেন। তার হাতের তৈরি প্রতিমা দেখতে এবং কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসেন।
পাঁচ বছর বয়সে যে মাটির সাথে কিশোরের পরিচয়, ৩৬ বছর পর সেই মাটিই হয়ে উঠেছে তার জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। নিজের শিল্পীসত্তা আর পরিশ্রম দিয়ে মাটির কাঠামোয় প্রাণের ছোঁয়া দেওয়ার পাশাপাশি এই পেশার মাধ্যমেই চলছে তার ছোট্ট সংসার।
দুর্গাপূজার আনন্দ যখন মানুষের ঘরে ঘরে, তখন সেই আনন্দের প্রতিমূর্তি গড়ে তুলতে নিভৃতে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কিশোরের মতো কারিগররা। তাদের হাতের নিপুণ ছোঁয়াতেই খড়, বাঁশ ও মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেব-দেবীর প্রতিমায়।


