খাওয়ার আগে হাত না ধোয়া, শৌচাগার ব্যবহারের পর তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসা কিংবা বাইরে থেকে ফিরে সরাসরি খাবার খাওয়া এমন ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই ছড়াতে পারে নানা জীবাণু। অথচ সাবান দিয়ে মাত্র ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার অভ্যাস অনেক সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় ব্যস্ততা। অফিস, স্কুল কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার তাড়া। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে বাইরে। কখনো বাসের হাতল, কখনো লিফটের বোতাম, কখনো বাজারের ব্যাগ, আবার কখনো মোবাইল ফোন সারাক্ষণই হাতের সংস্পর্শে আসছে নানা জিনিস। এরপর সেই হাত দিয়েই খাবার খাওয়া, চোখ-মুখ স্পর্শ করা কিংবা শিশুকে আদর করা হচ্ছে।
কিন্তু দিনের এই ব্যস্ততায় হাত ধোয়ার মতো সাধারণ একটি বিষয় কতবার উপেক্ষিত থেকে যায়, তা কি আমরা খেয়াল করি?
হাত দেখতে পরিষ্কার হলেই যে তা জীবাণুমুক্ত, এমন নয়। অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে জীবাণু খাবার, পানি কিংবা শরীরের সংবেদনশীল অংশে পৌঁছে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে শৌচাগার ব্যবহারের পর, খাবার তৈরির আগে এবং বাইরে থেকে ফিরে হাত পরিষ্কার না করার অভ্যাস নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নির্দেশনায় হাতের পরিচ্ছন্নতাকে ডায়রিয়াজনিত রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডায়রিয়া ও পেটের সংক্রমণ
অপরিষ্কার হাতের সাথে সবচেয়ে বেশি যে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ডায়রিয়া। মানুষের মল থেকে ছড়ানো জীবাণু হাতের মাধ্যমে খাবার বা পানিতে মিশে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য অন্ত্রের সংক্রমণ হতে পারে। দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমেও এসব রোগ ছড়ায়।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়াকে অবহেলা করা বিপজ্জনক। বারবার পাতলা পায়খানা হলে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা গুরুতর অবস্থায় প্রাণঘাতীও হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি পান এবং স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সর্দি-কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
হাতের মাধ্যমে শুধু পেটের অসুখই ছড়ায় না, কিছু শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও হাত ভূমিকা রাখতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দেওয়ার পর হাত দিয়ে বিভিন্ন বস্তু স্পর্শ করলে সেখানে জীবাণু থেকে যেতে পারে। পরে অন্য কেউ সেই বস্তু স্পর্শ করে অপরিষ্কার হাত দিয়ে নিজের চোখ, নাক বা মুখে হাত দিলে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
সাধারণ সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের জীবাণু এভাবে ছড়াতে পারে। তাই হাঁচি-কাশির পর, নাক পরিষ্কার করার পর এবং অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যা শেষে হাত ধোয়া জরুরি। তবে সব শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ একইভাবে ছড়ায় না; অনেক ক্ষেত্রে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণাও সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
খাবার থেকে বিষক্রিয়া ও অন্ত্রের অসুখ
রান্নাঘরে অসাবধানতা থেকেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কাঁচা মাছ-মাংস ধরার পর হাত না ধুয়ে অন্য খাবার তৈরি করা, শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত পরিষ্কার না করে রান্না করা কিংবা অপরিষ্কার হাতে খাবার পরিবেশন করার মাধ্যমে খাবারে ক্ষতিকর জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে খাবারজনিত সংক্রমণ, বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সালমোনেলা, কিছু ধরনের ই. কোলাই এবং নোরোভাইরাসের মতো জীবাণু অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষের ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে।
চোখ ও ত্বকের সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে
আমরা অনেক সময় না বুঝেই দিনে অসংখ্যবার চোখ, নাক ও মুখে হাত দিই। হাত অপরিষ্কার থাকলে জীবাণু চোখে প্রবেশ করতে পারে এবং কিছু ধরনের চোখের সংক্রমণ ছড়াতে পারে। একইভাবে হাতের মাধ্যমে কিছু জীবাণু ত্বকে পৌঁছে সংক্রমণ ঘটাতে পারে, বিশেষ করে ত্বকে কাটা বা ক্ষত থাকলে।
শিশুদের মধ্যে হাত-পা-মুখ রোগের মতো কিছু ভাইরাসজনিত সংক্রমণও অপরিষ্কার হাত ও দূষিত বস্তু থেকে ছড়াতে পারে। তাই শিশুদের খেলনা, খাবারের পাত্র এবং নিয়মিত স্পর্শ করা জিনিস পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কখন হাত ধোয়া সবচেয়ে জরুরি?
দিনে কতবার হাত ধুতে হবে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক সময়ে হাত ধোয়া। দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি মুহূর্তে এই অভ্যাস বিশেষভাবে জরুরি।
- খাবার খাওয়ার আগে এবং খাবার তৈরির আগে ও পরে।
- শৌচাগার ব্যবহারের পর।
- শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন বা শৌচাগার ব্যবহারে সহায়তা করার পর।
- কাশি, হাঁচি বা নাক পরিষ্কারের পর।
- কাঁচা মাছ-মাংস ধরার পর।
- অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যা করার আগে ও পরে
- ময়লা-আবর্জনা স্পর্শ করার পর।
- পশুপাখি বা তাদের বর্জ্য স্পর্শ করার পর।
সাবান ও পরিষ্কার প্রবাহমান পানি দিয়ে হাত ধোয়া সবচেয়ে ভালো। হাতের তালু, হাতের পিঠ, আঙুলের ফাঁক, নখের নিচের অংশ এবং বুড়ো আঙুল ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় দেওয়া উচিত। এরপর পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধুয়ে পরিষ্কার তোয়ালে বা উপযুক্ত ব্যবস্থায় শুকিয়ে নিতে হবে।
পানি না থাকলে কী করবেন?
বাইরে চলাচলের সময় সব জায়গায় সাবান ও পানি পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে হাত দৃশ্যত ময়লা, তৈলাক্ত বা নোংরা হলে সাবান ও পানি দিয়ে ধোয়াই ভালো। স্যানিটাইজার সব ধরনের জীবাণু ও রাসায়নিক পদার্থ দূর করতে পারে না।
অভ্যাসটি গড়ে উঠুক পরিবার থেকেই
হাত ধোয়ার গুরুত্ব জানলেও অনেকেই তা নিয়মিত মেনে চলেন না। কেউ তাড়াহুড়োর কারণে, কেউ অলসতায়, আবার কেউ হাত পরিষ্কার দেখেই মনে করেন আর ধোয়ার প্রয়োজন নেই। এই অবহেলা কমাতে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রেও হাত ধোয়ার অভ্যাসকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশুদের শুধু হাত ধুতে বললেই হবে না, বড়দেরও নিজেদের আচরণের মাধ্যমে তা শেখাতে হবে। বাড়িতে সাবান ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা রাখা, স্কুলে হাত ধোয়ার উপযোগী স্থান নিশ্চিত করা এবং খাবারের দোকান ও কর্মক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।
হাত ধোয়ার মতো সাধারণ একটি অভ্যাসের গুরুত্ব অনেক সময় অসুস্থ হওয়ার পর বোঝা যায়। অথচ একটু সচেতন হলেই অনেক সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। প্রতিবার খাবারের আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর কিংবা ময়লা কিছু স্পর্শ করার পর হাত ধোয়ার কথা মনে রাখলে নিজের পাশাপাশি পরিবারের অন্যদেরও সুরক্ষিত রাখা যায়।
রোগ প্রতিরোধের সব উপায় আমাদের হাতে নেই, কিন্তু পরিচ্ছন্ন হাত রাখার সিদ্ধান্তটি আমাদের হাতেই। তাই সুস্থ থাকতে বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা নয় শুরু হোক প্রতিদিনের ছোট্ট অভ্যাস, সাবান দিয়ে ঠিকভাবে হাত ধোয়া।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সিডিসি


