...|...|...

পর্যটন

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বদলাচ্ছে নিয়ম, থাকছে যেসব শর্ত

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:৪০
Shares
সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বদলাচ্ছে নিয়ম, থাকছে যেসব শর্ত

সেন্টমার্টিন দ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াত ও ভ্রমণ সংক্রান্ত যে বিধি-নিষেধ জারি করা হয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আমলে, তাতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। সেক্ষেত্রে পর্যটকদের রাত্রিযাপন ও ভ্রমণের সময়সীমায় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও ধারণা মিলছে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা, পরিবেশবিদ, পর্যটন সংশ্লিষ্টসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ১৫ই অক্টোবরের মধ্যে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।

পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, একদিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, একই সঙ্গে সেখানকার জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোও যেন নিশ্চিত করা যায় সে অনুযায়ী আমরা একটা গাইডলাইন তৈরি করবো।

এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্বীপটিতে পর্যটকদের ভ্রমণে ১২টি নির্দেশনা জারি করেছিল বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

দ্বীপটির বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ওই বিধি-নিষেধের ফলে দ্বীপটিতে গত এক বছরে পর্যটন ব্যবসায় যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, আবার জীবিকার জন্য গাছ কেটে ফেলা বা অবাধে মাছ ধরার মতো বিরূপ তৎপরতাও দেখা গেছে কিছু বাসিন্দার মধ্যে।

যে কারণে, সেখানকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা দ্রুতই বর্তমান সরকারের কাছে এই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখনই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে সব বিধি-নিষেধ জারি করা হয়েছিল তার মধ্যে যেগুলো যৌক্তিক সেগুলো বহাল রাখা হতে পারে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সেখানকার বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, এই প্রবালদ্বীপটিতে প্রায় দশ হাজার মানুষের বসবাস।

সেখানকার অপার সৌন্দর্য, পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্যের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি এই সময়ের মধ্যে প্রতিদিন কয়েক হাজার হাজার পর্যটক আসতেন দ্বীপটিতে।

যে কারণে ছোট এই দ্বীপটিতে থাকার জন্য গড়ে ওঠে অসংখ্য হোটেল-রিসোর্ট। পর্যটকরা এসে সেখানে রাত্রিযাপন করতেন।

এই দ্বীপের বাসিন্দাদের বাইরেও অনেকেই বাইরে থেকে ব্যবসায়িকভাবে বেশ কিছু আবাসিক হোটেলও গড়ে তুলেছিলেন।

সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহিম জিহাদী জানান, দ্বীপটিতে সব মিলিয়ে দেড়শোর মতো আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, যেগুলোয় অন্তত পাঁচ হাজারের মতো পর্যটকের আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যে ১২ দফা বিধি-নিষেধ জারি করা হয়েছিল সেখানে, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি এই দুই মাস নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক দ্বীপটিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ ছিল। তবে নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় সেন্টমার্টিনে ঘোরার অনুমতি ছিল, রাতে অবস্থান করা যেতো না।

তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সেই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে করে না বর্তমান সরকার, যে কারণে রাত্রিযাপন সংক্রান্ত এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়েও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকারের পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, যে মানুষটা ছয় বা সাত ঘণ্টা জার্নি করে যাচ্ছে, দুই ঘণ্টা থেকে আবার ছয় সাত ঘণ্টা জার্নি করে কক্সবাজার ফিরছে এটা একেবারেই আনহেলদি প্র্যাকটিস। এই বিষয় আমি ও আমাদের মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী (আব্দুল আউয়াল মিন্টু) একমত হয়েছি। এটি নিয়ে সক্রিয় আলোচনা করা হচ্ছে, আগের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আলোচনা হচ্ছে। যে জার্নি করে যাবে তাকে যদি আমরা রাত্রি যাপনের সুযোগ দেই সেটি ভালো হবে।

ট্যুর অপারেটরদের সংগঠনও এই বিষয়ে একমত যে, রাত্রি যাপনের বিষয়ে আগের সরকারের বিধি-নিষেধে পরিবর্তন আনা উচিত।

বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান বলেন, এই রাত্রি যাপন নিয়ে যে নিষেধাজ্ঞা এটাতে পর্যটকরা মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত হয়েছে। কারণ এত টাকা খরচ করে যখন একজন পর্যটক কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে যাবে, নিশ্চয়ই সে দুই ঘণ্টার জন্য এত দূরের পথ পাড়ি দেবে না। এই সিদ্ধান্তে যেন পরিবর্তন আসে সেটা আমরা চাই।

অন্তর্বর্তী সরকারের ওই ১২ দফা নির্দেশনা অনুযায়ী, শুধু ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে সেন্টমার্টিনে রাত কাটানোর সুযোগ রাখা হয়েছিল, তবে কতজন পর্যটক গিয়ে রাত্রি যাপন করতে পারবেন সেই সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল।

দিনে কেবল দুই হাজার পর্যটকের রাত্রি যাপনের অনুমতি ছিল। ওই নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনো সেন্টমার্টিনে নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটকের বেশি ভ্রমণ করার সুযোগ নেই।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের নীতিমালা রয়েছে সেখানে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে শুধু দুই হাজার পর্যটক গিয়ে রাত্রি যাপন করতে পারবেন। যারা যাবেন তাদেরকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই পাস দেওয়া হয়। যেহেতু বিধি নিষেধে এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি, ওই সংখ্যার বাইরে কোনো পর্যটক সেখানে যেতে পারবেন না এবং অবস্থান করতে পারবেন না।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলছিলেন, এখানে দীর্ঘদিন ধরে এই পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছিল। হঠাৎ করে এমন নিষেধাজ্ঞার কারণে ট্যুরিস্ট ব্যবসায় বেশ প্রভাব পড়েছে। এটি নিয়ে আমরা আমাদের অভিযোগগুলো পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।

তবে, বর্তমান সরকার পর্যটকের সংখ্যা কিংবা ভ্রমণের সময়সীমা আরো বাড়াবে কি-না সেই বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সেখানে কোন মাস থেকে কোন মাস পর্যন্ত যাওয়া যাবে, কতজন পর্যটক গিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারবে, সেখানকার ব্যবসায়ীরা কী চাচ্ছেন, পরিবেশের কতটুকু সীমাবদ্ধতা আছে তার সবই আমরা তাদের কাছ থেকে জানবো।

তিনি আরও বলেন, এ নিয়ে শুনানি বা বৈঠক হবে, সেই বৈঠকে তাদের বক্তব্যসহ সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে আগামী ১৫ই অক্টোবরের মধ্যে একটা গাইডলাইন দেওয়া হবে। যেখানে পরিবেশ যেন রক্ষা হয়, এবং ওখানে যারা বসবাস করে তাদের স্বার্থও যেনো রক্ষা হয় সেই বিষয়গুলো আমরা দেখবো।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের ব্যবসায়ী ও সেখানকার জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, এর আগে অক্টোবর থেকে মার্চ এই ছয় মাস দ্বীপটিতে ভ্রমণের সুযোগ ছিল। বিগত সরকার নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ভ্রমণের জন্য যে নির্দিষ্ট সময় সীমা করছে সেটিতে তারা পরিবর্তন চান।

সেক্ষেত্রে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত যেনো এই ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়, সে কথাও বলছেন তারা।

যদিও তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন পরিবেশবিদদের কেউ কেউ। পরিবেশবিদ মো. শামসুদ্দোহা বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে হলে এটার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা দরকার। একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া দরকার। সেটা কোনোভাবেই তিন মাসের বেশি নয়।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণে ক্ষেত্রে যে সব শর্ত দেওয়া হয়েছিল- সেখানে কোনো আলোকসজ্জাসহ বারবিকিউ পার্টি না করা, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টিও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এছাড়াও বিধি নিষেধের মধ্যে ছিল- দ্বীপটির কেয়াবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীব-বৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না।

একই সঙ্গে সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল না করা।

পরিবেশ রক্ষায় বিগত সরকারের এসব সিদ্ধান্ত খুব একটা কাজে আসেনি বলে মনে করেন দ্বীপটির জনপ্রতিনিধি ফয়েজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আগের চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। কারণ আগে মানুষ পর্যটক আসতো, পর্যটন নিয়ে ব্যস্ত থাকতো দ্বীপের লোকজন। এখন মাত্র দুই থেকে তিনমাস অল্প পর্যটক আসার কারণে এখন অনেকে গাছপালা কেটে বিক্রি করতেছে, জীবিকার তাগিদে অবাধে মাছ ধরতেছে, এতে আরো পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।

তবে, এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারও আগের মতো অবস্থানে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সবার আগে এই দ্বীপটিকে সুরক্ষা করতে হবে। এখানকার জীববৈচিত্র যাতে সুরক্ষিত হয় সেজন্য আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।

তিনি বলেন, আমরা প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেবো যেন কোনো পর্যটক প্লাস্টিক বা সিঙ্গেল পলিথিন নিয়ে দ্বীপে ঢুকতে না পারে। এটিকে বাস্তবায়ন করতে পরিবেশসহ কোস্টগার্ডের লোক, সবাইকে দায়িত্ব পালন করবে। এগুলো চেক করে প্রত্যেকটা জাহাজ ছাড়বে। কোনো পলিথিন বা প্লাস্টিক উঠতে পারবে না জাহাজে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।