বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বড় একটি অংশ সাতক্ষীরা জেলায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবছর পর্যটকেরা সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে যান। বিশেষ করে কলাগাছিয়া ও কচিখালী দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে এবার পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও সেখানে নেই কাঙ্ক্ষিত পর্যটকের চাপ। এর প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসা, স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগার এবং বন বিভাগের রাজস্ব আদায়ে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়কের বেহাল দশা এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ চলায় বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি, ধুলাবালি, খানাখন্দ ও যানজটে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। ফলে অনেক পর্যটক সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। চলতি বছর একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দুই মাসে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ১০ লাখ টাকা বা ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, রাজস্ব কমে গেলে সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও ব্যাহত হয়। পর্যটন কার্যক্রম বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ ছিল। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. এরফান উদ্দিন বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য গাইড ও নিরাপত্তাকর্মী দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বন বিভাগের টহল দলও পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া গেলে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’
সওজ সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। এ কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। ধুলাবালি, খানাখন্দ ও যানজটের কারণে কোথাও কোথাও চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এরই মধ্যে কয়েকটি পরিবহন তাদের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে।
সড়কের উন্নয়নকাজের বিষয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া ও কার্যাদেশ পেতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও মূল নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে। ফলে নির্মাণকাজের জন্য কার্যত প্রায় ১১ মাস সময় পাওয়া গেছে। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় শুধু সড়ক প্রশস্তকরণ নয়, সাতক্ষীরা শহরের লাবণী মোড় থেকে আলীপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ফোর লেন সড়ক নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি কুলিয়া, পালুদি ও বেতখালী এলাকায় তিনটি নতুন সেতুও নির্মাণ করা হবে।
এদিকে সুন্দরবনের নৌকা চালকেরাও পর্যটক কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। নৌকার চালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘তিন মাস পর সুন্দরবন খুলে দেওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম পর্যটক আসবেন। সেই অনুযায়ী নৌকা মেরামত করে প্রস্তুত করেছিলাম। কিন্তু রাস্তা খারাপ হওয়ায় মানুষ আসতে পারছে না। সারাদিন নৌকা ঘাটে বাঁধা থাকে। ট্রিপ ও ভাড়া নেই। আমরা বেকার বসে আছি।’
আরেক নৌকা চালক বলেন, পর্যটকদের অনেকেই তাদের কাছে সড়কের দুরবস্থার কথা জানান। পাশাপাশি পর্যটকদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ও নৌকায় ওঠার ঘাটের সুযোগ-সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। পর্যটক আসবেন-এমন আশায় ঋণ করে নৌকা মেরামত করলেও কাঙ্ক্ষিত পর্যটক না আসায় তারা বিপাকে পড়েছেন। তবে শীত মৌসুমে পর্যটক বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের ওপর নির্ভর করে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান। নৌকার চালক, পর্যটক পরিবহন, খাবারের দোকানসহ নানা পেশার মানুষ পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এসব মানুষের আয়ও কমেছে।
সিলেট থেকে সুন্দরবন দেখতে আসা এক পর্যটক বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ তার খুব ভালো লেগেছে। তবে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। সুন্দরবনে ভালো রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও ছোট পরিসরের বিনোদনব্যবস্থা থাকলে পর্যটকেরা আরও বেশি সময় কাটাতে পারতেন বলে তিনি মনে করেন। সুন্দরবন বাংলাদেশের গর্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের এখানে আসা উচিত।
আরেক পর্যটক বলেন, সুন্দরবনের সুন্দরী ও কেওড়া গাছসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ তাদের খুব ভালো লেগেছে। তবে সুন্দরবনে আসার সড়কটি খারাপ।
উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল হালিম বলেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটক যত বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতিও তত চাঙা হবে। দোকানপাটের বেচাকেনা বাড়বে এবং সরকারি রাজস্বও বাড়বে।
তিনি বলেন, সাতক্ষীরার সড়কের কাজ দ্রুত শেষ হলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে। সড়কের কারণে অনেক পর্যটক পিছিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি নেই। এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন আরও বিকশিত হবে। তবে পর্যটকেরা সুন্দরবনে এলে বন বিভাগ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সাতক্ষীরার অন্যতম বড় পর্যটন সম্পদ। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়কের কাজ দ্রুত শেষ হলে আসন্ন শীত মৌসুমে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


