সূর্যের দিকে খালি চোখে তাকানো বিপজ্জনক। তবে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে সূর্যের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, উজ্জ্বল পৃষ্ঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে কালো কালো দাগ। এগুলোই সানস্পট বা সূর্যকলঙ্ক।
দূর থেকে ছোট মনে হলেও এসব দাগের অনেকগুলোই পৃথিবীর আকারের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বড় হতে পারে। আর শুধু সৌন্দর্যের বিচিত্রতা নয়- সূর্যের এই কালো দাগগুলো সৌর ক্রিয়াকলাপের গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও বহন করে।
কেন তৈরি হয় সানস্পট?
সূর্য কোনো কঠিন পিণ্ড নয়; এটি মূলত অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমার বিশাল গোলক। এর অভ্যন্তরে চলমান পদার্থের প্রবাহ ও ঘূর্ণনের কারণে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়।
কখনো কখনো সূর্যের পৃষ্ঠের কোনো অঞ্চলে চৌম্বক ক্ষেত্র এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সেখান দিয়ে ভেতরের তাপ ওপরে ওঠার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ওই অঞ্চল আশপাশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা থাকে এবং কম আলো বিকিরণ করে। তাই সেটিকে কালো বা গাঢ় দাগের মতো দেখা যায়।
NOAA-এর তথ্য অনুযায়ী, আশপাশের অঞ্চলের তুলনায় সানস্পট প্রায় ১,৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠান্ডা হতে পারে। তবু এগুলো পুরোপুরি কালো নয়; আশপাশের তুলনায় কম উজ্জ্বল বলেই কালো দেখায়।
সানস্পটের সঙ্গে কেন আসে সৌরঝড়?
সানস্পটগুলো সূর্যের সক্রিয় অঞ্চলের দৃশ্যমান চিহ্ন। এসব অঞ্চলে জটিল ও শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে, যা কখনো সোলার ফ্লেয়ার বা করোনাল মাস ইজেকশন (CME)-এর মতো শক্তিশালী সৌর বিস্ফোরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ ধরনের বিস্ফোরণ থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি, বিকিরণ ও চার্জযুক্ত কণা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো পৃথিবীর দিকে এলে তৈরি হতে পারে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়।

এর প্রভাব পড়তে পারে স্যাটেলাইট, রেডিও যোগাযোগ, জিপিএস ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর। শক্তিশালী সৌরঝড় আবার আকাশে অরোরার দৃশ্যও তৈরি করতে পারে।
১১ বছরের চক্র
সূর্যের কার্যকলাপ স্থির নয়। প্রায় ১১ বছর পরপর এর সক্রিয়তা বাড়ে ও কমে। এই চক্রকে বলা হয় সোলার সাইকেল।
বর্তমান Solar Cycle 25 শুরু হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। NASA ও NOAA ২০২৪ সালের অক্টোবরে জানায়, সূর্য এই চক্রের solar maximum phase-এ প্রবেশ করেছে। তবে সর্বোচ্চ সক্রিয়তার নির্দিষ্ট মাস পরে নিশ্চিত করা যায়, কারণ ধারাবাহিকভাবে কার্যকলাপ কমতে শুরু করার পরই প্রকৃত peak নির্ধারণ করা সম্ভব।
অন্যদিকে, সূর্যের কার্যকলাপ যখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে, তাকে বলা হয় solar minimum। তখন সানস্পটের সংখ্যা অনেক কমে যেতে পারে, এমনকি কিছু সময়ে একেবারেই দেখা নাও যেতে পারে।
ইতিহাসের ভয়ংকর সৌরঝড়
সৌরঝড়ের প্রভাবের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো ১৮৫৯ সালের Carrington Event। এটি এখন পর্যন্ত নথিবদ্ধ সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় হিসেবে পরিচিত।
তখন টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক উজ্জ্বল অরোরা দেখা যায়। আজকের পৃথিবী যেহেতু স্যাটেলাইট, জিপিএস, রেডিও যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, তাই বড় ধরনের সৌরঝড় হলে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাবও গুরুতর হতে পারে।
মাউন্ডার মিনিমাম ও অস্বাভাবিক শীত
১৬৪৫ থেকে ১৭১৫ সালের মধ্যে সূর্যে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত কম সংখ্যক সানস্পট দেখা গিয়েছিল। এই সময়কে Maunder Minimum বলা হয়।

এই সময়ের সঙ্গে ইউরোপের তুলনামূলক ঠান্ডা সময়ের একটি সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে। তবে ইউরোপের ওই শীতল জলবায়ুকে শুধু সূর্যের কম সক্রিয়তার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়; জলবায়ুর ওপর আরও অনেক প্রাকৃতিক কারণ কাজ করে।
গ্যালিলিও ও সূর্যের ‘কলঙ্ক’
সানস্পট নিয়ে পর্যবেক্ষণের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। ১৭ শতকের শুরুতে গ্যালিলিওসহ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা টেলিস্কোপের মাধ্যমে সূর্যের গায়ে এই দাগগুলো পর্যবেক্ষণ করেন।
তৎকালীন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ধারণায় আকাশের বস্তুগুলোকে নিখুঁত ও অপরিবর্তনীয় মনে করার প্রবণতা ছিল। সূর্যের পৃষ্ঠেও যে পরিবর্তন ও দাগ রয়েছে, সানস্পটের পর্যবেক্ষণ সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণ তাই শুধু সূর্য সম্পর্কে জ্ঞানই বাড়ায়নি, মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুরোনো ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছিল।
আজ বিজ্ঞানীরা সানস্পটকে শুধু সূর্যের গায়ের রহস্যময় কালো দাগ হিসেবে দেখেন না। বরং এগুলোকে সূর্যের চৌম্বকীয় কার্যকলাপ বোঝার গুরুত্বপূর্ণ জানালা হিসেবে ব্যবহার করেন। সানস্পটের সংখ্যা ও পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা সূর্যের সক্রিয়তা এবং সম্ভাব্য মহাকাশ আবহাওয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করেন।

