...|...|...

বিশ্ব

নেপালে প্রলয়ংকরী বন্যা

সুদে ২ হাজার রুপি ধার করে একমাত্র ছেলের খোঁজে অসহায় পিতা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ২:২৬ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:০৩
Shares
সুদে ২ হাজার রুপি ধার করে একমাত্র ছেলের খোঁজে অসহায় পিতা

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের প্রলয়ংকরী বন্যায় নিখোঁজ একমাত্র ছেলেকে খুঁজতে ঘর ছেড়েছেন তাকার সাদার। পকেটে মাত্র ২ হাজার নেপালি রুপি (প্রায় ১৩ ডলার) ধার করা টাকা নিয়ে পাহাড়ি পথ চষে বেড়াচ্ছেন এই অসহায় পিতা। চরম হতাশা ও ক্ষোভ সত্ত্বেও হাল না ছেড়ে কুড়িয়ে আনা লাশের মাঝেও জীবিত সন্তানের সন্ধান করে চলেছেন তিনি।

রয়টার্সের তথ্য মতে, ৫০ বছর বয়সী তাকার সাদার নেপালের দক্ষিণ অঞ্চলের তরাইয়ের সপ্তারি জেলার বাসিন্দা। হিমালয় অঞ্চলের এই অংশের অধিবাসীরা ‘মাদেশি’ হিসেবে পরিচিত, যাদের রয়েছে একটি স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। সাদার তিন কন্যা থাকলেও তার একমাত্র সন্তান ১৯ বছর বয়সী বিনোদ গত ২৬ আগস্ট ভতেকোশি নদীর বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজ হন।

বন্যার এক মাস আগে উত্তরাঞ্চলের রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন বিনোদ। সেখানে তিনি সিমেন্ট মেলানোসহ বিভিন্ন খুচরা কাজ করতেন। তার সাথে কাজ করা ১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী আরও চার তরুণও এই বন্যায় নিখোঁজ রয়েছেন।

চোখের জল মুছতে মুছতে তাকার সাদার বলেন, আমার স্ত্রী কীভাবে বিলাপ করছে তা আমি বলতে পারব না। আমার নিজের বুকেও গভীর কষ্ট, আমি বুঝতে পারছি না কী করব।

অবিরাম সন্ধান ও কষ্টের পথচলা গায়ে বিবর্ণ সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা সাদার গায়ে জড়িয়েছেন একটি কমলা রঙের পলিথিন ব্যাগ, যা তার কাছে রেইনকোটের কাজ করছে। কাঁধে একটি ধূসর ব্যাকপ্যাক নিয়ে এই দীর্ঘ ও হতাশাজনক যাত্রায় তার সঙ্গী হয়েছেন তার ভাই।

সাদার পকেটে থাকা একটি ময়লা রুমালের মধ্যে ২ হাজার নেপালি রুপির কম কিছু ভাঙতি নোট গুঁজে রাখা আছে। বনাকবলিত এলাকাগুলোতে ঘুরে ছেলের সন্ধান পাওয়ার জন্য এই টাকা তিনি চড়া সুদে ধার করেছেন। তিনি বলেন, সপ্তারি থেকে এখানে আসার জন্য আমাকে টাকা ধার করতে হয়েছে। ধার করা প্রতি ১০০ রুপিতে আমাকে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে। সপ্তারি থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌঁছাতে দুই ভাই এই টাকার কিছু অংশ খরচ করেছিলেন। পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে ২৯২ কিলোমিটার (১৮১ মাইল) এই পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে নয় ঘণ্টা।

কাঠমান্ডুতে পৌঁছে বেঁচে যাওয়াদের তালিকা বা মৃতদের তালিকায় বিনোদকে খুঁজতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটেছেন সাদার ও তার ভাই। মর্গের বাইরে প্রদর্শিত ছবিগুলো প্রায়শই চেনার উপায় থাকে না, কারণ উদ্ধার হওয়া বেশিরভাগ লাশ পচে বা বিকৃত হয়ে গেছে। তবে হাসপাতালগুলোতে বিনোদের কোনো সন্ধান মেলেনি, এমনকি তার নাম বা ছবিও কোথাও ছিল না।

এরপর সাদার তার ছেলের কাজ করা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছাকাছি নুওয়াকোটের (কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে) দিকে পায়ে হেঁটে রওনা দেন। ভাঙা সড়ক ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিকর হাঁটার পর তারা ত্রিশুলী নামক একটি শহরে পৌঁছান, যার বাজার এখন ধ্বংসাবশেষ, কাদা ও পলিথিনে ঢাকা।

সাদার জানান, গতকাল রাতে এখানে পৌঁছানোর পর একটি লজ আমাদের থাকার জন্য ১,৫০০ নেপালি রুপি নিয়েছে। অথচ আমাদের এমন এক প্লেট সামান্য ভাত দেওয়া হয়েছে যা আমাদের ক্ষিধেই মেটাতে পারেনি। এখন যদি আমাদের আরও এক রাত এখানে থাকতে হয়, তবে আমার সব জমানো টাকা শেষ হয়ে যাবে এবং বাড়ি ফেরার মতো আর কিছুই থাকবে না।

সাদার ও তার ভাইয়ের অভিযোগ, বেঁচে যাওয়াদের উদ্ধার এবং দুর্যোগ অঞ্চল থেকে লাশ আনতে নিয়োজিত মর্গের বা সেনা ক্যাম্পগুলোর কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইলেও তাদের বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তাদের মতে, সহায়তার আকুতির প্রতি এই উদাসীনতা নেপালের মধ্যকার গভীরে প্রোথিত জাতিগত ও বর্ণগত বিভাজনেরই ফল। তরাইয়ের অধিবাসী মাদেশিরা পাহড়ভিত্তিক নেপালি এলিটদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছে। সাদার পরিবার তরাই এবং ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারে বসবাসকারী অত্যন্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ‘মুসহার’ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।

সাদার কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করেন, আমরা গরিব। তারা আমাদের মাদেশি ও বিহারি ভাবে। আমরা সাবলীলভাবে নেপালি বলতে পারি না—আর সে কারণেই তারা আমাদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে এবং এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘোরাচ্ছে। এমনকি সেটি কোনো লাশ হলেও তা দেখার আমাদের অধিকার আছে। আমরা পুলিশ স্টেশন থেকে শুরু করে সামরিক ক্যাম্প—সব জায়গায় আমাদের নাম নথিভুক্ত করেছি। কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করছে না।

এদিকে, এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার এই বিশাল বিপর্যয়ে দিশেহারা নেপালি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, তারা বেঁচে থাকা সব মানুষের কাছে পৌঁছাতে এবং তাদের সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ অসংখ্যবার বিনোদের মোবাইল নম্বরে কল করেও কোনো সাড়া পাননি দুই ভাই। সাদার বলেন, আমরা তার সাথে কথা বলতে পারছি না। তার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি না। তাই বাড়ির সবাই ভেঙে পড়েছে। আমার স্ত্রী আমাদের ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে বলেছে। তাই আমরা সব জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে খুঁজছি, কিন্তু তাকে কোথায় পাব?

এক মুহূর্তের জন্য সাদার একটি অলৌকিক খবরের আশা করেন। তিনি ভাবেন, আমার ছেলে তরুণ। সে একজন পোর্টার এবং দিনমজুর। তাই সে চটপটে। সে নিশ্চিতভাবেই কোথাও হেঁটে বা দৌড়ে যেতে পেরেছে।

তবে পরের মুহূর্তেই সেই পিতার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় চরম অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, আমার কোনো আশাই নেই। বিনোদ বেঁচে থাকলে সে নিশ্চিতভাবেই কোথাও না কোথাও থেকে ফোন করত, এমনকি সে পানি খেতে গেলেও তো যোগাযোগ করত।

তবুও হাল ছাড়ছেন না তিনি—অন্তত এখনই নয়। যে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনোদ কাজ করতেন, সেটির দিকে আবারও হাঁটা শুরু করার প্রস্তুতি নেন সাদার ও তার ভাই। যাওয়ার সময় বিশ্বাসঘাতকতা ও ক্ষোভের সুরে এক কড়া হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন এই পিতা।

তিনি চিৎকার করে বলেন, কেউ আমাদের কোনো উত্তর না দিলে বা সাহায্য না করলে আমাদের থানা জ্বালিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।