চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, অতীতে কি রাজনৈতিক বিবেচনায় পরীক্ষার ফলাফলে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা হতো?
বাংলাদেশে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের মতো পাবলিক পরীক্ষার ফল দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে গত ২৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, একসময় যেখানে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল, পরবর্তী সময়ে তা দ্রুত বাড়তে থাকে।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। অথচ ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন।
শুধু এসএসসি নয়, এইচএসসি ও অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষার ফলেও বিভিন্ন সময়ে পাসের হার ও সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়ার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফলাফলের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
গত ২৫ বছরের এসএসসি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০ সালের পর থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে ২০২৫ সাল থেকে এই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা যায়। টানা দুই বছর ধরে কমছে পাসের হার ও সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়ার সংখ্যা।
শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ বলছেন, সাম্প্রতিক ফলাফলে তুলনামূলক কঠোর মূল্যায়নের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, অতীতে ফল ভালো দেখানোর প্রবণতা থাকায় প্রকৃত চিত্র সবসময় প্রকাশ পায়নি।
এই পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ তুলে ধরছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, সাম্প্রতিক ফলাফলে তুলনামূলকভাবে বাস্তব মূল্যায়নের চিত্র উঠে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ফলাফলকে এক ধরনের ‘ব্র্যান্ডিং’-এর মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার মতে, মূল সমস্যাগুলো সমাধানের পরিবর্তে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, বরং সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করে।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান আরও বলেন, দেশে সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ায় শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টিও ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে। তার ভাষায়, আসন খালি থাকার আশঙ্কায় পাসের হার বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘‘মূল্যায়নকে একটা ব্র্যান্ডিং-এর মাঝে নিয়ে গেছি আমরা। মূল জায়গায় কেউ হাত দিচ্ছে না। আমাদের দেশের শিক্ষা খাতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো (বোর্ড/এনসিটিবি) নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সরকার যা বলে, সেটাই করে।’’
অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এখন কলেজ, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক এবং এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থাকার কারণে ফলাফলের পরিসংখ্যান বদলে যায়।
‘‘কলেজে আসন ফাঁকা থাকবে, সেজন্য আমি পাস করিয়ে দিবো? পাশের হার না বাড়লে ইউনিভার্সিটিগুলো ছাত্র পাবে কোথায়? এই পরিসংখ্যানই রেজাল্ট ঘুরিয়ে দেয়। তাই, এই রেজাল্ট দিয়ে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে, তা নিয়ে আমি আস্থা রাখতে পারি না।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষকদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
একই সাথে তিনি এ-ও জানান, সকল শিক্ষার্থী যদি জিপিএ-৫ পায়, তাহলে তিনি খুশি হবেন। "কিন্তু যে লেভেলে তারা পাস করছে, ওই লেভেলের সামর্থ্য যেন তারা অর্জন করতে পারে।"
জিপিএ-৫ ও পাসের হার বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, "আমরা খাতা দেখার ব্যাপারে নমনীয়তার কথা শুনি। হয়তো কারিকুলাম ছোট করা হয়েছে, প্রশ্নের ধরন চেঞ্জ হয়েছে। তবে যারা এ+ পাওয়ার, তারা ঠিকই পাচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো পলিসিগত ইস্যুর কারণে বেশি পেয়ে যাচ্ছে।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিজেদের সফলতা দেখাতে পাশের হার ও জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা ছিল।
অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ আরো বলেন,‘‘মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ওভার মার্কিং বা আন্ডার মার্কিং ইস্যুতে ধিরে ধিরে একটি সঠিক জায়গায় আসার চেষ্টা করবে সরকার। এ বছর পাশের হার যতটা হয়েছে সামনের বছর এই হার এর থেকেও কম হতে পারে,’’।


