...|...|...

ঢাকা

যে নদীপথে আসত পণ্য, সেই ময়নাকাটাই আজ অস্তিত্ব সংকটে

মাদারীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:০৫
Shares
যে নদীপথে আসত পণ্য, সেই ময়নাকাটাই আজ অস্তিত্ব সংকটে

অস্তিত্ব সংকটে ময়নাকাটা নদী। ছবি: টাইমস টুডে

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার প্রাণকেন্দ্র ঘেঁষে প্রবাহিত ময়নাকাটা নদী একসময় ছিল স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। ঢাকা থেকে এই নদীপথে পণ্য আসত শিবচর বাজারে। ট্রলারে করে শিবচর থেকে মাদারীপুরে যাতায়াত করতেন মানুষ। 

সময়ের ব্যবধানে দখল ও ভরাটে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদীটি। কোথাও কোথাও হারিয়েছে তার স্বাভাবিক আকৃতি, ব্যাহত হচ্ছে পানিপ্রবাহ, বন্ধ হয়ে গেছে নৌ চলাচল। একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ এখন অস্তিত্বসংকটে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর বিভিন্ন অংশে মাটি ফেলে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। পাঁচ্চর বাজারের আশপাশে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে নাব্যতা কমেছে। এতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ময়নাকাটা নদীর উৎপত্তি আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে। শিবচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে পাঁচ্চর ও মাদবরেরচর হয়ে নদীটি পদ্মার সাথে যুক্ত হয়েছিল। তবে বর্তমানে দুই নদীর সাথে সংযোগস্থলের একাধিক অংশ ভরাট হয়ে গেছে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশেও নদীটির প্রবাহ সরু হয়ে পড়েছে। নদীর ওই অংশে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। পদ্মার সাথে সংযোগস্থলের কিছু অংশে মাটি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে।

পাঁচ্চর এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেন, একসময় পদ্মা থেকে বর্ষায় প্রচুর পানি ময়নাকাটা নদীতে প্রবেশ করত। নদীপথে সহজেই পণ্য পরিবহন করা যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে পদ্মার সাথে সংযোগস্থল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ কমে গেছে। নদীর বিভিন্ন অংশে দোকানপাট ও ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও নদী এতটাই সরু হয়ে গেছে যে একে আর নদী বলে চেনা যায় না।

মাদবরেরচর এলাকার বাসিন্দা মাহবুব খান বলেন, ময়নাকাটা নদীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো পদ্মার সাথে সংযোগস্থল। ওই সংযোগ অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে মাটি ভরাট করে বাড়িঘর ও দোকানপাট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ফলে পদ্মা থেকে ময়নাকাটা নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এখন আর নেই।

চর টেকেরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. খালেক বলেন, আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ময়নাকাটা নদীর সরাসরি সংযোগ ছিল। এখন সংযোগস্থল বালু জমে পুরোপুরি ভরাট হয়ে আছে। আট-দশ বছর আগে খনন শুরু হয়েছিল। কিছুদিন কাজ চলার পর আর দেখা যায়নি। খননের কাজও পুরোপুরি হয়নি। দিন দিন নদীটি আরও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৭ সালে খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের ৩ জুন তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান শিবচর উপজেলার চর টেকেরহাট থেকে শিবচর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার নৌপথের খননকাজ উদ্বোধন করেন। 

১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের আওতায় আট লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করে নৌপথ সচল করার পরিকল্পনা ছিল। তবে প্রকল্পের আওতায় শেষ পর্যন্ত কতটুকু খনন করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কিছুদিন কাজ চলার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে খননকাজ শুরুর স্থানগুলোর কিছু অংশও ভরাট হয়ে গেছে।

একসময় যে নদী স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম ভরসা ছিল, তার এমন অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন এলাকাবাসী। তাদের মতে, নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়তে পারে। 

একইসাথে নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে আশপাশের কৃষিজমি ও জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে। তাদের দাবি, নদীর সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খনন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, বিআরএস নকশা ও পর্চা অনুযায়ী নদীটির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলার প্রতিটি নদী ও খালের প্রকৃত চিত্র বের করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদত মো. হাসান কবির বলেন, শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা নদী ময়নাকাটা নদীর অনেক স্থানেই দখল ও নাব্যতা সংকটে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার পথে। তবে এই মুহূর্তে ময়নাকাটা নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যক্রম আমাদের হাতে নেই। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ময়নাকাটা নদী উদ্ধার ও খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।