মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে জমি বিক্রি, সরকারি খাস জমির ভুয়া খারিজ ও জাল দলিল সৃষ্টির অভিযোগে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞ সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে চলমান একটি দেওয়ানি মামলায় ২নং আসামি ভুয়া আব্দুর রাজ্জাক লিখিত জবাব দাখিল করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গজারিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ জাল দলিল সম্পাদন চক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার পুরান বাউশিয়া গ্রামের মৃত আফতাব উদ্দিন প্রধানের ছেলে দলিল লেখক হাফেজ আহম্মেদ প্রধান ওই চক্রের অন্যতম হোতা। জাল দলিল সম্পাদনে দলিল লেখক হিসেবে রেফায়েত উল্লাহ ও আলী আকবরকে ব্যবহার করে বিভিন্ন জালিয়াতিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রটির সদস্য হিসেবে চর বাউশিয়া পশ্চিম কান্দি গ্রামের মৃত সাত্তারের ছেলে শিপন, বাউশিয়া ইউনিয়নের পরিষদের সাবেক মামুন মেম্বারসহ আরও কয়েকজনের নাম মামলায় ও স্থানীয়দের মুখে শোনা যাচ্ছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দেওয়ানি মোকদ্দমা নং-৩০৭/২০২৪ মামলায় বাদী মোঃ খোকন মিয়া গংয়ের মামলায় আসামি (বিবাদী) হিসেবে রয়েছেন আঃ মোনেম কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুল মোনেম গং। দাখিলকৃত লিখিত জবাবে ২নং আসামি ভুয়া আব্দুর রাজ্জাক (বিবাদীপক্ষ) উল্লেখ করেন। নালিশি সি.এস. খতিয়ান নং ২৮৩ দাগ নং ৩৮৩৭ নম্বর দাগভুক্ত ১১০ শতাংশ জমির মূল মালিক ছিলেন বেঙ্গু ও আলেকজান বিবি। পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তিটি বেঙ্গুর একমাত্র পুত্র ইব্রাহীম মিয়ার মালিকানা সম্পত্তি। ইব্রাহীম মিয়ার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির মালিক হন আব্দুর রাজ্জাক।
লিখিত জবাবে আরও বলা হয়, ইব্রাহীম মিয়ার ছেলে আব্দুর রাজ্জাক উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিক ও দখলদার ছিলেন। পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর সন্তানরা সম্পত্তির মালিক (উত্তরাধিকারী) হন। জবাবে অভিযোগ করা হয়, ১নং আসামি (বিবাদী) মো. আব্দুল মোনেম যোগসাজশের মাধ্যমে ভুয়া আব্দুর রাজ্জাককে গজারিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে গিয়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে তাকে দাতা দেখিয়ে একটি সাফ কবলা দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করান। ২নং আসামি ভুয়া আব্দুর রাজ্জাক (বিবাদীপক্ষের) দাবি, উক্ত দলিল সম্পূর্ণ বেআইনি, মিথ্যা ও বানোয়াট। এছাড়া লিখিত জবাবে ভুয়া আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট দলিলে আব্দুর রাজ্জাকের পিতার নাম ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তার পিতার নাম ইব্রাহীম বেপারী হলেও দলিলে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
লিখিত জবাবে আরও উল্লেখ করা হয়, বাদীপক্ষের দাবিকৃত ৩০ নভেম্বর ২০১৬ তারিখের ৫১১৮ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত সাফ কবলা দলিল আদালত বাতিল ঘোষণা করলে ২নং আসামি ভুয়া আব্দুর রাজ্জাক (বিবাদীপক্ষের) এ বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকবে না। এদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ, ভুয়া দাতা সৃষ্টি, ভুয়া এনআইডি কার্ড তৈরি, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে দলিল সম্পাদনসহ বিভিন্ন জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে দলিল লেখক হাফেজ আহাম্মদ প্রধান শত কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে দলিল লেখক হাফেজ আহম্মেদ প্রধান কাজ করছেন এবং দলিল লেখক রেফায়েত উল্লাহ ও আলী আকবর তার সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক হাফেজ আহম্মেদ প্রধান ও রেফায়েত উল্লাহর বক্তব্যে জানান, আমরা ভুলবশত মৃতকে জীবিত দেখিয়ে এরকম ৮/১০ দলিল সম্পাদন করেছি সত্যি। আসলে আমরা লোভে পরে ও আব্দুল মোনেম কোম্পানির পক্ষ থেকে মামুন মেম্বারসহ আরো কয়েকজনের চাপাচাপিতে দলিল সম্পাদন করেছি। এমন অন্যায় করা ঠিক হয় নাই। সচেতন হওয়ার দরকার ছিলো। এ কারণে জেলা রেজিস্টার স্যার আমাকে এবং রেফায়েত উল্লাহকে ডেকে নিয়ে গালিগালাজ করেছেন। ভবিষ্যতে যেন এমন কাজ আর না করি। এ বিষয়ে আব্দুল মোনেম কোম্পানির কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


