...|...|...

সারাদেশ

মুক্তিপণ দিয়ে ৩ দিন পর ঘরে ফিরলেন টেকনাফের মোস্তাক

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৯ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:২৪ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩:৩৯
Shares
মুক্তিপণ দিয়ে ৩ দিন পর ঘরে ফিরলেন টেকনাফের মোস্তাক

৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন টেকনাফের মোস্তাক। ছবি: সংগৃহীত

ছেলেদের দিকে তাকিয়ে আমার স্বামীকে ফেরত দিন‌- কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপহরণকারীদের কাছে এমনই আকুতি জানাচ্ছিলেন মুসতাক আহমদের স্ত্রী। স্বামীকে বাঁচাতে তিনি কত টাকা দিতে পারবেন, কোথা থেকে টাকা জোগাড় করবেন- কিছুই জানতেন না। শুধু জানতেন, যেকোনো মূল্যে স্বামীকে জীবিত ফিরে পেতে হবে। অবশেষে তিন দিন পর ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন টেকনাফের হ্নীলা বাজারের দর্জি দোকানদার মোস্তাক আহমদ (৩১)। 

শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মোস্তাক টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব পানখালী ৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার মৃত আব্দুস শুক্কুরের ছেলে। হ্নীলা বাজারে তার একটি দর্জির দোকান রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৫ আগস্ট বিকেল ২ টায় হ্নীলা কাঁচা বাজার থেকে মোস্তাক নিখোঁজ হন। ওইদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোস্তাকের পরিবারের কাছে ফোন আসে। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হয়, তাকে অপহরণ করা হয়েছে। দাবি করা হয় ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ। এরপর একের পর এক ফোন আসে। বাড়তে থাকে মুক্তিপণের অঙ্কও। কখনো ৫০ লাখ, কখনো ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকায় রাজি হয় অপহরণকারীরা।

পরিবারের ভাষ্য, মুক্তিপণের টাকা নিয়ে মোস্তাকের বোন-জামাইকে বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় যেতে বলা হয়। অপহরণকারীদের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে ৫ লাখ টাকা রেখে আসার পর তারা টাকা নিয়ে সেখান থেকে সরে যায়। পরে অন্য একটি জায়গায় মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। 

অপহরণকারীদের সাথে পরিবারের সদস্যদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে। ওই ফোনালাপে মুসতাকের স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপহরণকারীদের অনুরোধ করেন, তার স্বামীকে যেন মারধর বা হত্যা করা না হয়। 

তিনি বলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি টাকা জোগাড় করে দিচ্ছি। জবাবে অপহরণকারীরা হুমকি দিয়ে জানায়, ৫০ লাখ টাকা না দিলে মুসতাককে হত্যা করা হবে। এমনকি তারা দাবি করেন, মুসতাককে হত্যার জন্য একজন তাদের ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছে। স্বামীকে বাঁচাতে অসহায় স্ত্রী তখন বলেন, আমি যতটুকু পারি টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছি। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি এত টাকা কোথায় পাব? একপর্যায়ে সন্তানদের কথা উল্লেখ করে স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি।

পরে অপহরণকারীরা মোস্তাককে তার স্ত্রীর সাথে কথা বলার সুযোগ দেয়। তখন মোস্তাক দ্রুত টাকা জোগাড় করে দিতে স্ত্রীকে অনুরোধ করেন। তিনি জানান, তাকে হত্যার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে। স্বামীকে জীবিত ফিরে পেতে মোস্তাক‌ স্ত্রীকে প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে হলেও টাকা জোগাড় করার কথা বলেন তিনি। এদিকে অপহরণকারীরা হুমকি দেয়, বিষয়টি কাউকে জানানো হলে মুসতাককে হত্যা করা হবে। স্বামীকে বাঁচানোর আশায় তার স্ত্রী তখন বারবার অনুরোধ করে বলেন, আমি কাউকে বলব না। আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর মুসতাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনদিনের উৎকণ্ঠা, ভয় আর অনিশ্চয়তার পর পরিবারের কাছে ফিরে আসেন তিনি।

মোস্তাকের মা হাছান বানু বলেন, ছেলেকে অপহরণের পর আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। অপহরণকারীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করেছে। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর আমার ছেলে বাড়িতে ফিরেছে।

মোস্তাক নিখোঁজ হওয়ার পর তার শাশুড়ি নুর নাহার গত ৫ আগস্ট টেকনাফ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে মোস্তাক আহমদ নিখোঁজ হয়েছেন। জিডি নম্বর ২৭২।

তাকে উদ্ধার করতে ঘটনাস্থলে যাওয়া এক ব্যক্তি জানান, তার বন্ধু মোস্তাক পাওনা টাকা আদায়ের জন্য হ্নীলা থেকে সিএনজিযোগে বাহারছড়া এলাকায় এক ব্যক্তির কাছে যান। টাকা নিয়ে সিএনজিযোগে ফেরার পথে দুই ব্যক্তি সিএনজিতে থাকা মোস্তাকের মুখ চেপে ধরে তাকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। শনিবার বিকাল ৫টায় আমি এসব তার বোন জামাইসহ ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে রাত ৯টায় তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর মোস্তাকের কাছ থেকে এ তথ্য জানা গেছে বলে জানান। তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। 

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মোস্তাক নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। শনিবার তিনি অপহরণকারীদের কাছ থেকে ফিরে এসেছেন এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই বলেও জানান ওসি। মোস্তাককে কে বা কারা অপহরণ করেছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সাথে তার নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।