ইসলাম মানুষকে সম্মান, মর্যাদা ও নিজের মত প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। নবীজি (সা.)-এর জীবনে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ, প্রশ্ন ও ভিন্নমত প্রকাশের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবিরা নিজেদের মতামত ও যুক্তি তুলে ধরেছেন, আর রাসুল (সা.) তা শুনেছেন ও বিবেচনা করেছেন। তার জীবনের এমন পাঁচটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো।
১. খাউলার বিতর্ক ও আল্লাহর সমাধান
খাউলা বিনতে সা’লাবার স্বামী তাকে ‘জিহার’ (তালাকের একটি রূপ) করেছিলেন। রাসুল (সা.) তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার স্বামীর জন্য এখন হারাম।’ কিন্তু খাউলা (রা.) দমে যাননি। তিনি বারবার নবীজির কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন।
আল্লাহ-তাআলা তার কথা শুনে সুরা মুজাদিলার শুরুতে আয়াত নাজিল করলেন-আল্লাহ তার কথা শুনেছেন যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে তোমার (নবীজির) সাথে বাদানুবাদ করছে আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের দুজনের কথা শুনছেন, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (আয়াত: ১)
পরবর্তী আয়াতগুলোতে (আয়াত ২–৪) সমাধানটি এসেছে। সেখানে আল্লাহ জাহেলি যুগের এই নির্মম প্রথাকে বাতিল করে বিবাহ বিচ্ছেদের বদলে কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক পুনর্বহালের বিধান দেন।
২. বদর যুদ্ধের রণকৌশল
বদর যুদ্ধের সময় নবীজি (সা.) এক জায়গায় থামলেন। সাহাবি হুবাব ইবনে মুনজির (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এটি কি আল্লাহর নির্দেশে হচ্ছে, নাকি এটি যুদ্ধের কৌশল?’
নবীজি বললেন, ‘এটি যুদ্ধের কৌশল।’ তখন হুবাব নিজের ভিন্ন মত জানালেন। তিনি শত্রুদের পানির কাছাকাছি গিয়ে ক্যাম্প করার পরামর্শ দিলেন।
নবীজি তার যুক্তিটি পছন্দ করলেন এবং বললেন, ‘তুমি চমৎকার পরামর্শ দিয়েছ।’ রাসুল (সা.) তার পরামর্শ অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তন করলেন। (উয়ুনুল আসার ১/২৯৩)
৩. বদরের বন্দিদের নিয়ে বিতর্ক
বদর যুদ্ধের বন্দীদের কী করা হবে, তা নিয়ে নবীজি (সা.) সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করলেন। ওমর (রা.) বললেন, ‘এদের গর্দান উড়িয়ে দিন।’আবু বকর (রা.) বললেন, ‘আমি মনে করি তাদের ক্ষমা করে মুক্তিপণ নেওয়া উচিত।’নবীজি সবার কথা শুনলেন, কারও ওপর রাগ করলেন না। পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত এল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৩৫৫৫)
৪. বিচার নিয়ে বিতর্ক
রুবাই নামের এক নারী এক বালিকার দাঁত ভেঙে দিয়েছিলেন। ভুক্তভোগী পরিবার বিচারের দাবি জানায়। রাসুল (সা.) কিসাসের (প্রতিশোধের) নির্দেশ দিলেন।আনাস ইবনে নাজর (রা.) প্রতিবাদ জানালেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, রুবাইয়ের দাঁত কি ভাঙা হবে?’
নবীজি শান্তভাবে আল্লাহর বিধান স্মরণ করিয়ে দিলেন। শেষে পরিবারটি ক্ষমা করে দিলে বিষয়টি মিটে গেল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫০০)
৫. এক বেদুইনের সঙ্গে ঘোড়া নিয়ে বিতর্ক
রাসুল (সা.) এক বেদুইনের কাছ থেকে ঘোড়া কিনলেন। পরে বেদুইন বিষয়টি বুঝতে না পেরে ঘোড়াটি অন্য কারও কাছে বিক্রি করতে চাইলেন। তিনি নবীজির সাথে তর্কেও জড়ালেন।
রাসুল (সা.) শান্তভাবে তাকে নিজের যুক্তির কথা বললেন। শেষে সাহাবি খুজাইমার সাক্ষ্যে বিষয়টি সুরাহা হলো। নবীজি তখন খুজাইমার সাক্ষ্যকে দুজন মানুষের সমান মর্যাদা দিলেন। (আস-সুনানুল কুবরা: ১৩৪০৪)
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সাহাবিরা স্বাধীনভাবে নবীজির সাথে কথা বলতেন। যারা ইসলামকে জড়তা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে অভিযুক্ত করে, তারা ইসলামের মূল ইতিহাসের সাথে পরিচিত নয়।


