একই পরিবারে বেড়ে ওঠা, শৈশবের খেলনা ভাগাভাগি করে নেওয়া, একই উঠোনে হেসে-খেলে বড় হওয়া-ভাই-বোনের সম্পর্কের গভীরতা যেন এমনিতেই আলাদা। সময়ের সাথে সেই সম্পর্ক পেরিয়ে যায় শৈশবের গণ্ডি, ছড়িয়ে পড়ে জীবনের নানা অধ্যায়ে। আর সেই পথচলায় যখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় এসে আবারও পাশাপাশি দাঁড়ানোর সুযোগ মেলে, তখন সম্পর্কের বন্ধনে যোগ হয় নতুন আনন্দ, নতুন গল্প।
কুমিল্লার কোটবাড়ির লাল মাটির ক্যাম্পাস কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ৫০ একরের এই ক্যাম্পাস প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে। তাদের ভিড়ে আলাদা করে নজর কাড়ে কিছু মুখ-যারা শুধু সহপাঠী কিংবা বন্ধু নন; তারা একে অন্যের আপন ভাই-বোন, কেউ আবার যমজ। একই পরিবারের বন্ধন পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় একসঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্পগুলো হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসজীবনেরই এক মায়াময় অধ্যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশ, ক্লাসের চাপ, আড্ডা কিংবা ভবিষ্যতের ক্যারিয়ার ভাবনা-সবকিছুতেই তারা একে অপরের বড় ভরসা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এমনই কয়েকজন সহোদর ও যমজ ভাই-বোনের গল্প থাকছে এই আয়োজনে।
একই বিভাগে দুই জীবনের প্রতিচ্ছবি: দুই বোনের এক গল্প
বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে পরীক্ষার হল, এমনকি অ্যাসাইনমেন্টের সময়সীমা-সবকিছুতেই যেন তাদের জোড়ায় জোড়ায় উপস্থিতি। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন দুই যমজ বোন। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের কাজী ফাহমিদা কাঁনন ও ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের কাজী সানজিদা কাঁকন।
চেহারা, হাঁটাচলা ও কথা বলার ধরনে দারুণ মিল থাকায় শিক্ষক থেকে সহপাঠী-অনেকেই প্রায়ই তাদের নিয়ে মজার ভুল বোঝাবুঝিতে পড়েন।
তবে একসঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার গল্পটাও কম রোমাঞ্চকর নয়। প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যজন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান। কিন্তু দুই বোনের স্বপ্ন ছিল একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। সেই স্বপ্ন পূরণে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দেন ছোট বোন। শেষ পর্যন্ত এক ব্যাচ জুনিয়র হয়ে তিনিও ভর্তি হন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে।
ছোট বোন কাজী সানজিদা কাঁকন বলেন, “দুই বোন একই বিভাগে পড়ছি-বিষয়টি আমার কাছে দারুণ লাগে। বোন এক ব্যাচ সিনিয়র হওয়ায় একাডেমিক বিষয় নিয়ে আমার খুব একটা চিন্তা করতে হয় না। কোনো কিছু বুঝতে সমস্যা হলে ও আমাকে সাহায্য করে।”
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “ভর্তি পরীক্ষার সময় নানা জটিলতায় প্রথমবার আমাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছিল। পরে বোন কুবিতে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তার কাছ থেকে বিভাগ সম্পর্কে অনেক কিছু শুনতাম। ওর অভিজ্ঞতায় বিভাগটিকে খুব শিক্ষার্থীবান্ধব মনে হয়েছিল। পরিবার চেয়েছিল আমি আইন বিষয়ে পড়ি, সেই সুযোগও ছিল। কিন্তু বোনের কাছ থেকে সাংবাদিকতা সম্পর্কে শুনে এই বিষয়টির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বোনের জুনিয়র হয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই।”
গণিত আর সাংবাদিকতা: দুই ভিন্ন মেরুর এক সেতু
একজনের দিন কাটে গাণিতিক সূত্র ও সংখ্যার জটিলতা নিয়ে, অন্যজনের ব্যস্ততা গণমাধ্যম ও তথ্যের বিশ্লেষণে। গণিত বিভাগ ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এমন দুই ভাই-বোন হলেন ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মো. শরিফুল আলম বিজয় ও সুলতানা রাজিয়া আশা।
পড়ার বিষয় ভিন্ন হলেও এই পার্থক্য তাদের সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং একে অপরের জগতকে জানার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া, বিকেলের ক্যাফেটেরিয়ায় আড্ডা কিংবা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে সময় কাটানো—এসব নিয়েই গড়ে উঠেছে তাদের ক্যাম্পাসজীবনের গল্প। এর সাথে যোগ হয়েছে বোনের হাতের রান্নার স্বাদও।
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শরিফুল আলম বিজয় বলেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি হলো ভাই-বোন দুজনের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া। ছোটবেলা থেকেই আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি। তাই একে অপরকে ছাড়া দূরে কোথাও থাকাও কঠিন ছিল। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে আমরা দুজনই একে অপরের খেয়াল রাখতে পারি। বাসা থেকে আসা-যাওয়া নিয়েও কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। বোনের যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকতে পারি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বড় ভাইও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। আমরা চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনজনই কুবিয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সবচেয়ে সুন্দর বিষয় ছিল—আমরা দুজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছি। তবে বিভাগ আলাদা হয়েছে আমাদের শিক্ষাগত পটভূমির কারণে। আমি বিজ্ঞান বিভাগের হওয়ায় গণিত বিভাগ বেছে নিয়েছি, আর বোন মানবিক বিভাগের হওয়ায় সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছে।”
দুই বিশ্ববিদ্যালয়, এক লক্ষ্য: দূরত্বেও অটুট বন্ধন
একজন পড়ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগে, অন্যজন রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা হলেও তাদের স্বপ্ন ও পথচলায় রয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা।
একজন কুমিল্লার শান্ত পরিবেশে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যজন ব্যস্ত ঢাকার মধ্যে সামলাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়জীবন। ক্যাম্পাস আলাদা হলেও প্রতিদিনের ক্লাস, সেমিস্টার পরীক্ষার চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—সবকিছুই ভাগাভাগি করে নেন তারা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুব হাসান বলেন, আমি ও আমার ভাই হালিম—দুজনই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগে এবং আমার ভাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। আজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিষয়টি ভাবতে ভালো লাগে। তবে এখানে আসার পথটা আমাদের জন্য সহজ ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের আর্থিক অবস্থার কারণে নিয়মিত অফলাইনে কোচিং করার সুযোগ ছিল না। বাসায় থেকেই পড়াশোনা করতে হয়েছে। এমনকি এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র তিন মাস আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের খুব বেশি ধারণা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েও দূরত্বের কারণে ভর্তি হতে না পারার মতো কঠিন সময় গেছে আমাদের। তখন আমরা দুই ভাই একে অপরকে সাহস দিয়েছি। একজনের কোনো সমস্যা হলে অন্যজন পাশে থেকেছি। এভাবেই পুরো পথটা একসঙ্গে পেরিয়ে আজ এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।
দুই বোনের এক স্বপ্ন: লাল মাটির কুবি
লাল মাটির ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়ে ছোট বোনের জন্য স্বপ্নের পথ তৈরি করেন বড় বোন। ছোটবেলা থেকেই বড় বোনকে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখে বেড়ে ওঠা ছোট বোনও সেই স্বপ্নকে নিজের করে নেন। তারা হলেন ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সালমা বেগম এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের একই বিভাগের ফাতেমা বেগম।
একই পড়ার টেবিল থেকে একই বিশ্ববিদ্যালয় ও একই বিভাগে ভর্তির যাত্রা-সেই গল্প বলতে গিয়ে সালমা বেগম বলেন, একই বিশ্ববিদ্যালয় ও একই বিভাগে দুই বোন হিসেবে পড়াশোনা করা আমাদের জন্য সত্যিই আনন্দের ও গর্বের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমরা একসঙ্গে উপভোগ করি। একসঙ্গে পড়াশোনা করা, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা এবং প্রয়োজনের সময় একে অপরকে সাহায্য করা আমাদের সম্পর্ককে আরও সুন্দর করেছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই এবং উৎসাহ দিই। একই জায়গায় পড়াশোনা করার কারণে আমাদের বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়াও আরও গভীর হয়েছে। আমাদের কাছে এটি শুধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বিষয় নয়; বরং একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা, এগিয়ে যাওয়া এবং সুন্দর স্মৃতি তৈরি করার বিশেষ সুযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় ক্যাম্পাসটি একদিন পুরোনো হবে। বাঁধভাঙা আড্ডা, ক্লাস শেষে তাড়াহুড়া কিংবা বিকেলের ক্যাফেটেরিয়ার সেই ব্যস্ততাও একসময় থেমে যাবে। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ, শহীদ মিনার কিংবা লাল পাহাড়ের ভাঁজে জমে থাকা এই ভাই-বোনদের স্মৃতিগুলো থেকে যাবে আজীবন। ক্যাম্পাসজীবনের সেই দিনগুলো হয়তো একসময় হয়ে উঠবে পুরোনো অ্যালবামের সবচেয়ে প্রিয় কিছু পাতা।

