...|...|...

স্বাস্থ্য

বয়স ৫০ পেরোলেই কি ওজন কমানো কঠিন?

ইসরাত জাহান প্রিয়ানা
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৩৯ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪১
Shares
বয়স ৫০ পেরোলেই কি ওজন কমানো কঠিন?

পুষ্টিবিদ ইসরাত জাহান প্রিয়ানা। ছবি: টাইমস টুডে

অনেকেই নিয়মিত খাবার নিয়ন্ত্রণ করছেন, ভাত-রুটি অর্থাৎ কার্বোহাইড্রেট কম খাচ্ছেন, হাঁটাচলা করছেন; এমনকি ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের সমস্যাও চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন কিংবা বর্ডার লাইনে আছে। তবু প্রত্যাশা অনুযায়ী ওজন কমে না। বিশেষ করে ৫০ বছর বয়সের পর অনেকের ক্ষেত্রে ওজন কমানোর গতি ধীর হয়ে আসে। তখন স্বাভাবিকভাবেই পেশেন্টদের মনে প্রশ্ন জাগে—খাবার নিয়ন্ত্রণের পরও কেন ওজন কমছে না? 

মূলত বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের গঠন, পেশির পরিমাণ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং হরমোনের কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন আসে। বয়সজনিত কারণে পেশির ভর ও শক্তি কমতে থাকে। পেশি কমে গেলে দৈনন্দিন কাজকর্মে শরীরের শক্তি ব্যয়ের পরিমাণও কমে যেতে থাকে। ফলে আগে যে পরিমাণ খাবার খেয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো, পরবর্তী সময়ে একই খাদ্যাভ্যাসে ওজন বেড়ে যাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে বয়স বাড়লেই সবার বিপাকক্রিয়া কমে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। 

দৈনন্দিন চলাফেরা, পেশির পরিমাণ, শারীরিক অবস্থা, রোগের মাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।মেনোপজ ও হরমোনের পরিবর্তনের প্রভাবজনিত কারনে

নারীদের ক্ষেত্রে পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সে ইস্ট্রোজেন হরমোনের পরিবর্তনের কারণে শরীরে চর্বি জমার ধরন বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়তে পারে।

এ সময়ে ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি এবং শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়াও ওজন নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে অনেকটা। তবে শুধু হরমোনের পরিবর্তনই ওজন বৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। খাদ্যাভ্যাস, বংশগত বৈশিষ্ট্য ও জীবনযাপনও সমানভাবে বিবেচ্য।

তবে প্রশ্ন থেকে যায় :ডায়াবেটিস ও থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ওজন কমে না কেন?

ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকা মানেই ওজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। ওজন কমার জন্য শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় উপযুক্ত পরিমাণে শক্তি গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা এবং পেশির ভর বজায় রাখা জরুরি। আবার ডায়াবেটিসের কিছু ওষুধ, ইনসুলিনসহ নির্দিষ্ট চিকিৎসা ও অন্যান্য ওষুধের কারণে কারও কারও ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ওজন বাড়তে পারে বা ওজন কমানো কঠিন হতে পারে।

হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা চললেও ওজন কমার গতি ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়। তাই শুধু ওজন না কমার কারণে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়; কিংবা মেডিসিন বন্ধ করা ঠিক নয়।চিকিৎসকের মাধ্যমে রোগের নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো পর্যালোচনা করে নির্দিষ্ট ডোজ গ্রহন করা প্রয়োজন।

আবার অনেক সময় মানুষ মনে করেন, তারা খুব কম খাচ্ছেন তবুও ওজন লক হয়ে যাবার নৈপথ্যে কি রহস্য রয়েছে বা করনীয় কি হতে পারে!

কিন্তু খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি খাবারের ধরন, রান্নায় ব্যবহৃত তেল, চা-কফিতে চিনির ব্যবহার, বিস্কুট, বাদাম, মিষ্টি পানীয় এবং খাবারের মধ্যবর্তী নাশতার পরিমাণও হিসাব করা জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাবারও প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেলে ওজন কমার গতি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত খাবার কমিয়ে দিলে দুর্বলতা ও পেশির ক্ষয় হতে পারে।এমনকি স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসলের প্রভাবেও ওজন বাড়তে পারে। তাই না খেয়ে থাকা বা হঠাৎ কঠোর ডায়েট অনুসরণ না করে ব্যক্তির বয়স, ওজন, উচ্চতা, রোগের অবস্থা, শরীরের এবং দৈনন্দিন কাজের ধরন অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত।

তবে ওজন কমানোর শুরুর দিকে শরীরের ওজন তুলনামূলক দ্রুত কমতে পারে,কেননা সেসময় ওয়াটার ওয়েট লস হয়। কিন্তু ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের শক্তির চাহিদাও কমে যায়। ফলে আগের খাদ্যতালিকা অনুসরণ করলেও ওজন কমার গতি ধীর হয়ে যেতে থাকে। এ ছাড়া শরীরে পানি ধরে রাখা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং দৈনন্দিন চলাফেরা কমে যাওয়াও স্বল্পমেয়াদে ওজনের পরিবর্তনকে প্রভাবিত করে । কয়েক দিন ওজন একই থাকলেই ডায়েট ব্যর্থ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও ঠিক নয়। কয়েক সপ্তাহের ওজনের প্রবণতা, কোমরের মাপ এবং শারীরিক সক্ষমতার পরিবর্তন একসঙ্গে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

বয়স ৫০ এর পরে মেটাবলিজম স্লো হয়ে আসে।এসময় নিয়মিত ফলোআপ জরুরি।হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনে হরমোন থেরাপি চিকিৎসকের পরামর্শে গ্রহণ করা যেতে পারে।একইসাথে লো ক্যালরী ডায়েটের পরিবর্তে ব্যালেন্সড ডায়েট অনুসরন করা উচিত।মেটাবলিক স্বাস্থ্য বিবেচনায় মেনোপজের পর ওয়েট কমাতে ব্যক্তিভেদে পারসোনালাইজড ডায়েট প্ল্যান অনুসরন করতে একজন পুষ্টিবিদ বা ডায়েটিশিয়ান এর পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা মেনে চলা উচিত।

লেখক: পুষ্টিবিদ 

এভার ড্রীম ফার্টিলিটি কেয়ার ও সেন্ট্রাল হসপিটাল (হেমায়েতপুর,সাভার)