...|...|...

অপরাধ

বেরিয়ে এলো বিমানের সাবেক এমডির বাসার গৃহকর্মী নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা

টাইমস টুুডে প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:২৪
Shares
বেরিয়ে এলো বিমানের সাবেক এমডির বাসার গৃহকর্মী নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা

ছবি: সংগৃহীত

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাফিকুর রহমানের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করা ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। শিশুটির আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাতে অভিযোগপত্রে মারধর, গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া, চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটানো এবং শৌচাগারে আটকে রাখার মতো নির্যাতনের বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার সপ্তম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়েছেন।

গত ৩১ আগস্ট ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা-পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। দুই আসামি জবানবন্দিতে নির্যাতনের কিছু ঘটনা স্বীকার করেছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

যেভাবে সামনে আসে নির্যাতনের ঘটনা

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসায় শিশুদের দেখাশোনার জন্য নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে ওই শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে নেওয়া হয়। মেয়ের বিয়ে ও অন্যান্য খরচ বহনের আশ্বাস পেয়ে তার হোটেলকর্মী বাবা গত বছরের জুন মাসে তাকে ওই বাসায় পাঠান।

শিশুটির বাবার অভিযোগ, গত বছরের ২ নভেম্বর তিনি সর্বশেষ মেয়েকে দেখতে ওই বাসায় গিয়েছিলেন। এরপর আর মেয়েকে পরিবারের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।

চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি সাফিকুর রহমানের স্ত্রী ফোন করে শিশুটির অসুস্থতার কথা জানিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলেন। মেয়েকে আনতে গিয়ে বাবা তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পান। পরে তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ ঘটনায় পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি শিশুটির বাবা মামলা করেন। মামলার পর চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে সাফিকুর রহমান ও রুপালী খাতুন জামিনে মুক্তি পান। বীথি আক্তার ও সুফিয়া বেগম কারাগারে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশুর জবানবন্দিতে নির্যাতনের বিবরণ

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার এক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে জবানবন্দি দেয় শিশুটি। অভিযোগপত্রে সেই জবানবন্দির বরাতে বলা হয়েছে, বাসায় তার দায়িত্ব ছিল গৃহকর্তার শিশুসন্তানকে দেখাশোনা করা এবং শিশুটি মাটিতে কিছু ফেলে দিলে তা তুলে রাখা।

শিশুটির অভিযোগ, বাসায় যাওয়ার পর থেকেই গৃহকর্ত্রী বীথি আক্তার তাকে মারধর করতেন। একপর্যায়ে গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। চিৎকার করলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে আঘাত করা হতো। তার ঊরু, হাত ও পিঠেও মারধর করা হয়েছে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া চোখে মরিচের গুঁড়া ছিটানো এবং পাথরের পুতা বা নোড়া দিয়ে আঘাত করে দাঁত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও করেছে শিশুটি। বাসার অন্য দুই গৃহকর্মীর বিরুদ্ধেও নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে সে।

তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, শিশুটিকে শৌচাগারে আটকে রাখা হতো। সেখানে বেঁচে থাকার জন্য শৌচাগারের পানি ও টুথপেস্ট খাওয়ার কথাও জবানবন্দিতে জানিয়েছে শিশুটি।

অভিযোগপত্রে সাফিকুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার স্ত্রী শিশুটির ওপর নির্যাতন চালালেও তিনি তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে সাফিকুর রহমানের আইনজীবী আরিফুর রহমান অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য, শিশুটি জবানবন্দিতে বলেছে যে সে সাফিকুর রহমানকে কখনো দেখেনি। তার দাবি, সাফিকুর নিজে শিশুটিকে মারধর করেননি। অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ায় তারা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবেন।

বীথি ও সুফিয়ার জবানবন্দিতে যা এসেছে

মামলার নথি অনুযায়ী, গত ২১ ফেব্রুয়ারি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বীথি আক্তার। সেখানে তিনি শিশুটিকে তিন-চার দিন মারধর করার কথা স্বীকার করলেও গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

বাসার আরেক গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমও আদালতে জবানবন্দি দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটি নারকেল তেল ও সাবান চুরির অভিযোগ করেছিল বলে তিনি ক্ষুব্ধ হন এবং দুই দিন তাকে মারধর করেন।

সুফিয়ার জবানবন্দিতে আরও বলা হয়েছে, বীথি বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে মারধর করতেন। একদিন বীথির নির্দেশে গরম খুন্তি নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও তিনি তা নিয়ে যাননি বলে দাবি করেন সুফিয়া। পরে বীথি নিজেই রান্নাঘর থেকে গরম খুন্তি এনে শিশুটির বাঁ পায়ের ঊরুতে ছ্যাঁকা দেন বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

সুফিয়া আরও দাবি করেন, শিশুটির চিৎকার শুনে তিনি তার ঊরুতে ঠান্ডা পানি ও ক্রিম লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তবে কী কারণে শিশুটিকে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছিল, তা তিনি জানেন না বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।

মেয়ের চিকিৎসা ও বিচারের দাবি বাবার

মামলার বাদী ও শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন এখনো তার মেয়ের শরীরে রয়েছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ে এবং দৃষ্টিশক্তিও কমে গেছে বলে তার অভিযোগ। মেয়েকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে আর্থিক সংকটে রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। তার বক্তব্য, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর কোনো শিশুর জীবনে না ঘটে।