বর্ষার টানা বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পাহাড়ঘেরা রাঙামাটির ছোট-বড় অসংখ্য ঝরনা ও জলপ্রপাত। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলধারা আর সবুজ অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্যে বদলে গেছে পুরো জনপদের চিত্র। কাপ্তাই হ্রদ, পাহাড় ও সবুজ প্রকৃতির পাশাপাশি বর্ষার ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই রাঙামাটিতে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ।
রাঙামাটির সুবলংয়ের বড় ও ছোট ঝরনা, কাউখালীর ঘাগড়া ঝরনা, বিলাইছড়ির ধুপপানি, মুপ্পোছড়া, গাছকাটাছড়া ও শতপাপড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ঝরনায় এখন বাড়ছে পর্যটকদের আনাগোনা। বর্ষার বৃষ্টিতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলধারা ঝরনাগুলোকে দিয়েছে নতুন রূপ। কোথাও পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে স্রোত, কোথাও আবার পাহাড়ি ছড়ার পানি নেমে তৈরি করছে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে নৌপথে সহজে পৌঁছানো যায় বলে সুবলং ঝরনা দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। তবে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে দুর্গম পাহাড়ের ঝরনাগুলোও। বিলাইছড়ির ধুপপানি, মুপ্পোছড়া কিংবা গাছকাটাছড়ার মতো ঝরনায় যেতে পাড়ি দিতে হয় খাড়া পাহাড়ি পথ, ঝিরি ও পাথুরে দুর্গম পথ। আর সেই কষ্টকর পথ পেরিয়ে ঝরনার কাছে পৌঁছানোর আনন্দই যেন বাড়িয়ে দেয় ভ্রমণের রোমাঞ্চ।
কাউখালীর ঘাগড়া ঝরনাতেও বর্ষা মৌসুমে বেড়েছে পর্যটকের ভিড়। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পর্যটকরা ঝরনার পানিতে ভিজে উপভোগ করছেন পাহাড়ের নির্মল প্রকৃতি।
চট্টগ্রাম থেকে ঘাগড়া ঝরনায় ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী আফিয়া খানম বলেন, এখানে মূলত পাহাড়ের সৌন্দর্য ও ঝরনা দেখতেই মানুষ আসে। আমি প্রতিবছরই চট্টগ্রাম থেকে আসি, যখন পানি বেশি থাকে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা আসেন। ঝরনার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে ভালো লাগে, মনটাও ভালো হয়ে যায়।”
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক জাহিদ হোসেন বলেন, আমরা ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে দেখে রাঙামাটিতে এসেছি। রাঙামাটি খুবই সুন্দর একটি জায়গা। কিন্তু বর্ষার মৌসুমে রাঙামাটি যে এতটা সুন্দর হবে, তা অকল্পনীয়। আজকে আমরা ঝরনায় এসেছি। ঝরনার পানিতে আমাদের মন জুড়িয়ে যাচ্ছে।”

পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় চাঙা হয়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসাও। হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌযান, পরিবহন, স্থানীয় গাইডসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যস্ততা। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
রাঙামাটি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বন কুমুস বড়ুয়া বাপ্পী বলেন, আমরা চেষ্টা করি এই সময়টাতে আমাদের পর্যটকদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা দেওয়ার। ইতোমধ্যে আমাদের পর্যটকদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ডিসকাউন্ট অফার করেছি। এ ছাড়া আরও যেসব সুবিধা ও সেবা দেওয়া যায়, বছরের এই সময়টাতে আমরা সেগুলো দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা চাই, এই সময়ে রাঙামাটিতে পর্যটক আসুক এবং রাঙামাটির আসল সৌন্দর্য উপভোগ করে যাক।”
রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন,ৎএই বর্ষায় আগত পর্যটকদের জন্য আমরা আমাদের কটেজ, ঝুলন্ত ব্রিজ, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রস্তুত রেখেছি। সেইসাথে পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন কালচারাল প্রোগ্রামসহ বিশেষ আয়োজনও করে থাকি।”
তবে ঝরনাকেন্দ্রিক পর্যটনের প্রসারের সাথে সাথে বাড়ছে নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি ঝরনাগুলোতে বর্ষায় পিচ্ছিল পথ, পাহাড়ধস ও আকস্মিক পানির স্রোতের ঝুঁকি থাকে। তাই পর্যটকদের স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইডের সহযোগিতা নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্যও হুমকি হয়ে উঠছে পাহাড়ি পরিবেশের জন্য।
জলবায়ু কর্মী ম্যামা চিং বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ঝরনার আশপাশে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এসব প্লাস্টিক ঝরনার পানির সাথে বিভিন্ন ফসলের জমিতে গিয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি কৃষকরাও বিপাকে পড়ছেন।
তিনি বলেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সচেতনতামূলক নির্দেশিকা স্থাপন, নিয়মিত ক্যাম্পেইন এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগে নয়, পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রস্তুত রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশও।
ট্যুরিস্ট পুলিশের রাঙামাটি জোনের উপপরিদর্শক উইলিয়াম ত্রিপুরা বলেন, বর্ষা মৌসুমে পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারেন, সে কারণে ট্যুরিস্ট পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি এবং জেলার সব পর্যটনকেন্দ্রে আমাদের টহল কার্যক্রম জোরদার করেছি। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না যাওয়া এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য পর্যটকদের আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ষায় ঝরনাকে ঘিরে পর্যটকের আগমন বাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে ইতিবাচক প্রভাব। পর্যটকদের যাতায়াতে নৌযান ও পরিবহন, থাকার জন্য হোটেল-মোটেল, খাবারের জন্য রেস্তোরাঁ, স্থানীয় গাইড এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সাথে যুক্ত মানুষজন সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।
পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে রাঙামাটির ঝরনাগুলোকে ঘিরে তৈরি হতে পারে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা।
প্রকৃতির এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা। পর্যটকদের সচেতনতা, প্রশাসনের নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বর্ষার ঝরনাগুলো শুধু রাঙামাটির পর্যটনকেই সমৃদ্ধ করবে না, পাহাড়ি জনপদের স্থানীয় অর্থনীতিতেও যোগ করতে পারে নতুন মাত্রা।



