প্রতিষ্ঠার সাত দশকেও পাবনা মানসিক হাসপাতালের বহির্বিভাগে নির্মাণ হয়নি একটি বিশ্রামাগার। ফলে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তার স্বজনরা। যুগের পর যুগ একটি পুরোনো ছোট ভবনে চলছে বহির্বিভাগের কার্যক্রম। নেই বসার বা বিশ্রাম করার আলাদা কোনো ভবন। রোগী নিয়ে বহির্বিভাগের সামনে গাদাগাদি করে, কখনও খোলা মাঠে আর গাছতলায় বসে থাকতে হয় স্বজনদের।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পাবনা মানসিক হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের বয়োবৃদ্ধ আব্দুল লতিফ এর সাথে। তিনি জানান, মানসিক রোগে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসা করাতে এসেছেন পাবনা মানসিক হাসপাতালে।
আগেরদিন মঙ্গলবার রওনা হয়ে পাবনায় পৌঁছাতে রাত হয়ে যাওয়ায় পাননি রাত কাটানোর মতো জায়গা। পরে বাধ্য হয়ে হাসপাতাল সংলগ্ন পুলিশ ফাঁড়ির বারান্দায় ছেলেকে নিয়ে রাত কাটান তিনি। এটা সীমাহীন কষ্ট আর দুর্ভোগ। সকালে আসেন বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখাতে।
শুধু আব্দুল লতিফ-ই নন। তার মতো আরো শতাধিক মানুষকে একই ভোগান্তি পোহাচ্ছে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানসিক রোগী নিয়ে যান পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। কেউ মধ্যরাতে, কেউ ভোরে পাবনায় পৌঁছে কাটাতে হয় দূর্বিষহ সময়। হাসপাতালের অভ্যন্তরে নেই থাকার বা বিশ্রাম করার মতো কোনো ব্যবস্থা। রোগী নিয়ে বহির্বিভাগের সামনে গাদাগাদি করে, কখনও খোলা মাঠে, গাছতলায় বসে থাকতে হয় তাদের।
খুলনার দিঘুলিয়া থেকে রোগী নিয়ে এসেছেন পরিমল কুমার মণ্ডল। তিনি জানান, খুলনা থেকে ট্রেনযোগে ঈশ্বরদী জংশন স্টেশনে নেমেছেন রাতে। রোগী নিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে স্টেশনেই রাত কাটাতে হয়েছে তাদের। সকালে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসার পর এখানে নেই কোনো বসার বা বিশ্রাম নেয়ার ব্যবস্থা। যদি একটা বিশ্রামাগার থাকতো তাহলে সবার জন্য উপকার হতো।
মাগুরা থেকে রোগী নিয়ে এসেছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, এতদূর থেকে জার্নি করে এসে এখানে যে একটু বিশ্রাম নেবো, ভাল একটা বসার পরিবেশ কিছুই নাই। এ কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সরকার যদি এ বিষয়ে একটা থাকার সুব্যবস্থা করতো তাহলে সবার জন্য ভাল হতো।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের মনোরোগ চিকিৎসক সামিনা আক্তার বলেন, সবচেয়ে বেশি জরুরী পারিবারিক সচেতনতা। যতদিন পরিবার, স্বজন সচেতন না হবে ততদিন মানসিক রোগী নিয়ে ভোগান্তি থাকবে। এখনকার সময়ে শিশু কিশোর তরুণ সবাই কমবেশি ডিভাইসে আসক্ত হচ্ছে। বাবা-মা তাদেও সন্তানদের সাথে সময় দিচ্ছে না, দূরত্ব বাড়ছে। ডিভাইস থেকে তাদের দূরে সরিয়ে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে হবে।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী বা তার স্বজনদেও বিশ্রাম বা থাকার ব্যবস্থা নেই স্বীকার করে পাবনা মানসিক হাসপাতালের আবাসিক মনোরোগ চিকিৎসক একেএম শফিউল আযম বলেন, পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিকমানের হাসপাতালের রূপান্তর করার চিন্তা করছে সরকার। সেই প্রকল্পে একটা আলাদা ওয়ার্ডই থাকবে যেখানে রোগীরা থাকবে। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে রোগীরা ভর্তির সুযোগ পাবে। আর রোগীর স্বজনদের জন্য আলাদা হলরুম বা ডরমেটরী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাঁচশ’ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা মানসিক হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে চিকিৎসা নিতে যান ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী।


