পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ওয়েবসাইটে প্রবেশাধিকার সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাতারভিত্তিক এই সংবাদমাধ্যমটি পিওকে অঞ্চলে চলমান বিক্ষোভ ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরকারের কঠোর দমন-পীড়ন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
যদিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা ব্লক করার ঘোষণা দেয়নি, তবুও দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন যে তারা আল জাজিরার ইংরেজি ভাষার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারছেন না।
এ বিষয়ে পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আল জাজিরার সংবাদ পরিবেশনকে ‘বাছাই করা’ এবং ‘ভুল উপস্থাপন’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পাক মন্ত্রণালয় জানায়, মুজাফফরাবাদের কয়েকটি নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্র থেকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিবেদন তৈরি করে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের (এজেকে) নির্বাচন ও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে আল জাজিরা।
তাদের দাবি, নির্দিষ্ট সময়ে ধারণ করা দৃশ্য এবং বাছাই করা কিছু ব্যক্তির বক্তব্য ব্যবহার করে সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। একে ‘ইয়েলো জার্নালিজম’ বা অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেশটির সরকার জানিয়েছে, এটি এমন কিছু বাহ্যিক শক্তির উদ্দেশ্য পূরণ করছে যারা এই নির্বাচনকে অবৈধ প্রমাণ করতে এবং সাধারণ জনগণের গণরায়কে দুর্বল করতে চায়।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলকে ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর (এজেকে)’ হিসেবে অভিহিত করে থাকে, অন্যদিকে ভারতের অবস্থান হলো এই পুরো অঞ্চলটি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সংবাদ সংগ্রহের ওপর চলমান এই কড়াকড়ি ও দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সিপিজে উল্লেখ করেছে যে, চলমান বিক্ষোভের মধ্যে ওই অঞ্চলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যন্ত দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা, টেলিযোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি, সংবাদ সংগ্রহে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ এবং সাংবাদিকদের আটক বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে সংগঠনটি। সিপিজে অবিলম্বে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের প্রতি সাংবাদিকদের ওপর থেকে সব ধরনের দমন-পীড়ন বন্ধ করার, তথ্যপ্রবাহ স্বাভাবিক করার এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠনটি বিশেষভাবে স্বাধীন সাংবাদিক রাজি তাহির এবং তার সহকর্মী মুহাম্মদ সাইফের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সিপিজের দাবি অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট রাজধানী ইসলামাবাদে তাদের নিজস্ব কার্যালয় থেকে পুলিশের পোশাক পরিহিত কিছু ব্যক্তি দুজনকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বা তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পূর্ণ অজানা রয়েছে। সিপিজে জানিয়েছে, যদি তারা রাষ্ট্রের হেফাজতে থেকে থাকেন, তবে পাকিস্তান সরকারকে তা স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং বিনা কারণে আটক রাখা হয়ে থাকলে তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। এছাড়া গত ১ আগস্ট আরেক কাশ্মীরি সাংবাদিক রাজা ইকরামকে ইসলামাবাদে আটক করা হলেও পরবর্তীতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংগঠনটি।
সিপিজের তথ্য অনুযায়ী, কাশ্মীর-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশের ঠিক পরপরই আল জাজিরার ওয়েবসাইট ও প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত ৫ জুন থেকে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় আংশিক ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং কঠোর টেলিযোগাযোগ বিধিনিষেধ বলবৎ রয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সব মিলিয়ে এই ঘটনাগুলো অঞ্চলটিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।


