প্রায় চার বছর পর কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে আবারও অনুষ্ঠিত হলো গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার টান, পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা নৌকা আর নদীর দুই তীরে বিপুলসংখ্যক মানুষের উচ্ছ্বাসে শুক্রবার প্রাণ ফিরে পায় গড়াই নদীর তীর। নৌকাবাইচকে ঘিরে নদীপাড়ে বসেছে গ্রামীণ মেলাও।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে কুষ্টিয়ার ঘোড়াই ঘাট থেকে হরিপুর ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত নৌকাবাইচ ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে নদীর তীরে জড়ো হন। বিকেল ৪টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় প্রতিযোগিতা।
নৌকাগুলো নদীর বুকে ছুটে চলার সঙ্গে সঙ্গে তীরের দর্শকরাও উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। পছন্দের নৌকা এগিয়ে গেলে করতালি, স্লোগান ও উল্লাসে মাঝিদের উৎসাহ দেন তারা। বৈঠার ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে গড়াই নদীর দুই পাড় হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
নৌকাবাইচ উপলক্ষে নদীর তীরে বসেছে গ্রামীণ মেলা। মেলায় দেশীয় খাবার, খেলনা ও বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর দোকান বসেছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই মেলায় ঘুরে বেড়ান।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী এ নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ও কয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইমরান হোসেন ইউনুস সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহবার উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। প্রধান বক্তব্য দেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব, কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বি, কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও দৈনিক মুক্তমঞ্চ পত্রিকার সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
আয়োজকরা জানান, নৌকাবাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের মিলনমেলার একটি অংশ। হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়ানোই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ইমরান হোসেন ইউনুস বলেন, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেই নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন এ ধরনের আয়োজন না থাকায় যুবসমাজের একটি অংশ মাদকসহ নানা অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাই তাদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি, মাদক থেকে দূরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি আরও বাড়াবে। প্রতিবছর নৌকাবাইচ আয়োজনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহবার উদ্দিন বলেন, গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলা ও লোকজ সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর বিএনপির নেতা তারেক রহমান গুরুত্ব দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামীণ ঐতিহ্য মানুষের মাঝে ফিরিয়ে আনার নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় গড়াই নদীতে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে যুবসমাজকে খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। খেলাধুলা তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি মাদক ও সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে রাখতে ভূমিকা রাখে। নৌকাবাইচের মতো আয়োজন নতুন প্রজন্মকে শেকড় ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করে।
কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, প্রতিবছর নিয়মিতভাবে নৌকাবাইচ আয়োজন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাও আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে। এসব আয়োজন একদিকে লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করবে, অন্যদিকে যুবসমাজকে মাদক ও সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে তার পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গ্রামীণ খেলাধুলা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে।
আয়োজকরা জানান, নৌকাবাইচের প্রথম দিনে প্রায় সাতটি নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। আগামী রোববার ফাইনাল প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনব্যাপী এ আয়োজন।


