ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল আসার পরও জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও দুর্বলতায় ভুগছেন অনেকে। কারও কারও ক্ষেত্রে কয়েক দিন জ্বর থাকার পরও নির্দিষ্ট কোনো রোগ শনাক্ত হচ্ছে না। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া ছাড়াও ইনফ্লুয়েঞ্জা, রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি), অ্যাডিনোভাইরাসসহ পরিচিত বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তাহলে এসব জ্বরের পেছনে কি নতুন কোনো ভাইরাস রয়েছে, নাকি পরিচিত ভাইরাসের সংক্রমণই এর কারণ?
নতুন ভাইরাসের প্রমাণ মেলেনি
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বরের রোগীদের মধ্যে নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলমের মতে, বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ পরিচিত কয়েকটি রোগের সংক্রমণ রয়েছে। পাশাপাশি আরএসভি ও অ্যাডিনোভাইরাসের মতো শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসও জ্বরের কারণ হতে পারে।
তিনি জানান, আইইডিসিআরে ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্তের জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। তবে দেশের সব জ্বরের রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। ফলে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষায় নেগেটিভ আসা অনেক রোগীর জ্বরের প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, নির্দিষ্ট ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা না করা হলে শুধু উপসর্গ দেখে সংক্রমণের ধরন নিশ্চিত করা কঠিন।
পরীক্ষায় কিছু ধরা পড়ছে না কেন?
এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. নেলসন তাপস মণ্ডল বলেন, বর্তমানে জ্বর নিয়ে আসা অনেক রোগীর ক্ষেত্রে মূলত ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ কিংবা অন্যান্য ভাইরাসের পরীক্ষা নিয়মিতভাবে করা হচ্ছে না।
তিনি জানান, ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে না। কারও রক্ত পরীক্ষায় কিছু পরিবর্তন দেখা গেলেও অনেকের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায় না। আবার কিছু রোগীর সুস্থ হতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে।
নতুন কোনো ভাইরাসের সংক্রমণ কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব রোগীর পক্ষে এসব পরীক্ষার ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি সব ধরনের ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষার সুবিধাও সব হাসপাতালে নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, জ্বরের কারণ হিসেবে নতুন কোনো ভাইরাসের কথা ভাবার আগে পরিচিত রোগগুলোর সম্ভাবনা বিবেচনা করা জরুরি। ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণেও জ্বর হতে পারে।
উপসর্গে মিল থাকায় বিভ্রান্তি
চিকিৎসকদের ভাষ্য, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও কোভিড-১৯-এর উপসর্গের মধ্যে বেশ মিল রয়েছে। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও দুর্বলতা একাধিক রোগের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
ডেঙ্গুতে সাধারণত হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরব্যথা, বমিভাব ও ত্বকে ফুসকুড়ি হতে পারে। চিকুনগুনিয়ায় জ্বরের পাশাপাশি অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা দেখা যায়। অন্যদিকে, ইনফ্লুয়েঞ্জায় জ্বরের সাথে সর্দি, কাশি, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথা হতে পারে।
তবে ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেই নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু হয়নি বলা যায় না। কোন ধরনের পরীক্ষা করা হয়েছে এবং জ্বর শুরুর কত দিন পর পরীক্ষা করা হয়েছে, তার ওপর ফলাফলের নির্ভরতা থাকতে পারে। তাই উপসর্গ ও পরীক্ষার ফল চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা জরুরি।
জ্বরের প্রকোপ কি বেড়েছে?
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বরের রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তবে রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় কতটা বেড়েছে, তা নিশ্চিত করতে হাসপাতালভিত্তিক তথ্য ও রোগের বিস্তারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
অধ্যাপক ডা. নেলসন তাপস মণ্ডল জানান, বর্তমানে জ্বরের রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, এমনটিও বলা যাচ্ছে না।
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর মতে, ঋতু পরিবর্তনের সময় বাংলাদেশে সাধারণত জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের পাশাপাশি ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রমণও এর কারণ হতে পারে।
জ্বর হলে কী করবেন, কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ, জ্বর হলে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর সংক্রমণ থাকায় জ্বরের কারণ যা-ই হোক, ডেঙ্গুর সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে কখনো কখনো জ্বর কমে যাওয়ার পরও শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর নেমে গেলেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তক্ষরণ, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, নিস্তেজ হয়ে পড়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
জ্বর হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং পানি ও তরল খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। জ্বর ও শরীরব্যথা কমাতে প্রয়োজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্য ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। বিশেষ করে ডেঙ্গুর আশঙ্কা থাকলে নিজে থেকে ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।



