ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন সার্বিয়ার দীর্ঘ সময়ের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ। তবে ক্ষমতা ছাড়লেও আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
রয়টার্সের তথ্যমতে, সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি-এর টিকিটে রাজনীতি করা ভুচিচ ২০১৪ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে একক আধিপত্য বজায় রেখে আসছেন। সংবিধান অনুযায়ী টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ না থাকায়, এবার তিনি সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
তার পদত্যাগের পর দেশটির সংসদ স্পিকার এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্র আনা ব্রনাবিক নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। ভুচিচ জানিয়েছেন, পদ ছাড়ার আগে তার শেষ কাজগুলোর একটি ছিল ৪৯ জন ব্যক্তিকে ক্ষমা ঘোষণা করা, যার মধ্যে বিক্ষোভের সাথে সম্পর্কিত অপরাধে দণ্ডিত ২৩ জন ব্যক্তিও রয়েছেন।
রেলস্টেশন ট্র্যাজেডি থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত
গত বছরের ১ নভেম্বর উত্তর কোসোভার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনে কংক্রিটের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই মূলত এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এর পর থেকেই সার্বিয়ার ইতিহাসে গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম বিক্ষোভ গড়ে তোলেন শিক্ষার্থীরা, যেখানে রাজপথে নেমে আসেন লাখ লাখ সাধারণ মানুষ।
বিক্ষোভকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের জোরালো অভিযোগ তুলেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ভুচিচ ও তার সহযোগীরা নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
ছাত্র আন্দোলনটি সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দলের সমর্থনে ‘স্টুডেন্টস উইন’ ব্যানারে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তাদের ২৫০ জন প্রার্থীর তালিকায় মূলত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং নানা পেশার বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তির তদন্ত, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধ এবং সরকারি তহবিলের ব্যবহারে বৃহত্তর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
কিছু জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে যে, ছাত্র-সমর্থিত এই আন্দোলন ভুচিচের দলের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এই জরিপগুলোর সত্যতা ও পদ্ধতি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা বেশ কঠিন। বেলগ্রেডভিত্তিক সম্পাদক ও কলামিস্ট দেজান ইলিক আল জাজিরাকে বলেন, আগাম নির্বাচন দেওয়ার কৃতিত্ব কোনোভাবেই একা ভুচিচের প্রাপ্য নয়। তিনি বলেন, সার্বিয়া ভালো অবস্থায় নেই—জনগণ এই কথা বলেছে, তারাই নির্বাচন দাবি করেছে এবং তারাই নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছে।
‘প্রকৃত সংকট শুরু হতে পারে নির্বাচনের পর’
সাবেক সার্বিয়ান সংসদ সদস্য এবং মানবাধিকার কর্মী আইদা করোভিক বলেন, জনগণের ক্ষোভ কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, গত কয়েক মাস ধরে সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রূপান্তর ঘটছে। তবে আমার আশঙ্কা, আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনের পরেই মূলত সার্বিয়ার আসল সংকট শুরু হতে পারে। এই সরকার সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, তারা সংগঠিত অপরাধের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা সম্ভাব্য সব ধরনের পথ বেছে নেবে।
পদত্যাগের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুচিচ জানিয়েছেন যে, বিরোধী দলগুলো জয়ী হলে তিনি সেই ফলাফল মেনে নেবেন এবং একই সন্ধ্যায় তার প্রতিপক্ষদের অভিনন্দন জানাবেন।
আঞ্চলিক রাজনীতির ওপর প্রভাব
সার্বিয়ার এই রাজনৈতিক সংকট পশ্চিম বলকান অঞ্চলজুড়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ বেলগ্রেড সরকার বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, মন্টিনিগ্রো এবং কসোভোর সার্ব সম্প্রদায়ের সাথে গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ফলে সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলি দেশের সীমানা ছাড়িয়েও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বানজা লুকায় অবস্থিত ফ্রিডরিখ এবার্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান তানজা টপিক বলেন, সার্বিয়ার রাজনৈতিক দিকের পরিবর্তন পুরো অঞ্চলেই স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। তিনি বলেন, সার্বিয়ার রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি পুরো অঞ্চলের জন্যই স্বস্তির বার্তা বয়ে আনবে। তার মতে, বেলগ্রেড বছরের পর বছর ধরে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে মিশ্র বার্তা পাঠিয়ে আসছে—তারা নিজেদের শান্তি ও সমৃদ্ধির সমর্থক হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ক্ষেত্রে এই প্রভাব বিশেষ করে দৃশ্যমান বলে উল্লেখ করেন টপিক। পাশাপাশি বিগত বছরগুলোতে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেরও অবনতি ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের রাতারাতি কোনো অলৌকিক ঘটনার আশা করা উচিত নয়। মূল্যবোধের পরিবর্তন একটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া হবে, তবে আমার মনে হয় পরিবর্তন না আসলে মানুষের হতাশা সার্বিয়া ও পুরো অঞ্চলের জন্য আরও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপ ও সংঘাতের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
প্রায় ৬০ লাখ জনসংখ্যার দেশ সার্বিয়া পশ্চিম বলকানের সবচেয়ে বড় দেশ এবং এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। চীনা বিনিয়োগ, রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ এবং সম্প্রতি ইসরায়েলের সাথে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে ভুচিচ দেশকে উদীয়মান অর্থনৈতিক সফলতার গল্প হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছেন।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেশী সদস্য দেশগুলোর তুলনায় সার্বিয়ার সাধারণ মানুষের গড় মজুরি এখনও বেশ কম। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সার্বিয়ায় মাসিক গড় নিট বেতন ছিল ১ হাজার ৩২ ইউরো (১ হাজার ১৭৪ ডলার), যেখানে পার্শ্ববর্তী ইইউভুক্ত দেশ ক্রোয়েশিয়ায় এই পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৫৫ ইউরো (১ হাজার ৭৭০ ডলার)—যা ইইউ সদস্যের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ কম। জীবনযাত্রার মানের এই ব্যবধানই ভোটারদের নির্বাচনী মাঠে ফেরার আগে জনমতের মূল বিতর্কের অন্যতম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশাপাশি সার্বিয়ার বর্তমান এই রাজনৈতিক সংকট এমন এক সময়ে ঘনীভূত হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে দেশটির অমীমাংসিত যুদ্ধকালীন অতীত। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে কসোভো যুদ্ধের সময় ন্যাটো তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ফেডারেল রিপাবলিকের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেসময় সার্বিয়া শাসন করতেন স্লোবোদান মিলোশেভিচ। ১৯৯০-এর দশকের বলকান যুদ্ধের সেই ঐতিহাসিক ছায়া আজও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে বসনিয়ান সার্ব আর্মির সাবেক কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচ বেলগ্রেডে দাফন করা হয়, যাকে বসনিয়ায় সংঘটিত গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল দণ্ড দিয়েছিল। বেশ কয়েকজন সার্ব মন্ত্রীর উপস্থিতিতে এবং সামরিক মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুদ্ধাপরাধের মহিমান্বিতকারীদের ইইউ ব্লকে কোনো স্থান নেই।
ফলস্বরূপ, অক্টোবরের এই নির্বাচন কেবল সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং পশ্চিম বলকানের অন্যান্য দেশের সাথে এর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


