...|...|...

চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রতি মিলিলিটার পানিতে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৫৩ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৪৩
Shares
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রতি মিলিলিটার পানিতে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া

চট্টগ্রাম ওয়াসা। ছবি: টাইমস টুডে

চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা, নলকূপ ও বাণিজ্যিক জারের পানির মান নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব উৎসের পানিতে অনুমোদিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি বাসাবাড়িতে ২০-৩০ মিনিট ফুটানো কিংবা ফিল্টারে শোধনের পরও পানিতে বিপুল পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া থেকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) খসড়া মহাপরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘হেলিওন’-এ প্রকাশিত ওই গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণায় চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি, হালিশহর, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, বন্দর ও সরাইপাড়া এলাকা থেকে ওয়াসা, নলকূপ ও জারের পানির ৩৬টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ১৪৯ জন বাসিন্দার কাছ থেকে পানির মান নিয়ে মতামত নেওয়া হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ৯ হাজার ২৫০ থেকে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। বাসাবাড়িতে শোধনের পরও প্রতি মিলিলিটারে ৩ হাজার ৪শ থেকে ১০ হাজার ৩শ ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। নলকূপের পানিতে অপরিশোধিত অবস্থায় ৬৮০ থেকে ১৩ হাজার ৫শ এবং শোধনের পর ৬৮০ থেকে ১০ হাজার ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। জারের পানিতেও অপরিশোধিত অবস্থায় ১৫০ থেকে ১ হাজার এবং শোধনের পর ১শ থেকে ৬৫০ ব্যাকটেরিয়া মিলেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চান্দগাঁও এলাকার ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১৪ হাজার ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এক মিলিলিটার পানিতে প্রায় ২০ ফোঁটা ধরলে এক ফোঁটায় থাকে প্রায় ৭শ ব্যাকটেরিয়া। বন্দর এলাকার নলকূপের পানিতে প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৬৭৫টি ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। শোধনের পরও সেখানে প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৫শ ব্যাকটেরিয়া থেকে গেছে।

শুধু জীবাণু নয়, পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতিও উদ্বেগজনক। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, খাবার পানিতে এ ধরনের কণার গ্রহণযোগ্য সীমা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ১০ মিলিগ্রাম। অথচ ওয়াসা ও নলকূপের পানিতে তা ৪০ থেকে ১ হাজার ৮৮৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। কোতোয়ালি এলাকার ওয়াসার পানি ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই শোধনের পর ভাসমান কণার পরিমাণ আরও বেড়েছে।

গবেষকদের ধারণা, বাসাবাড়ির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার না করা বা ত্রুটিপূর্ণ থাকার কারণে শোধনের পরও পানিতে দূষণ থেকে যাচ্ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ওয়াসার পানি ব্যবহারকারীদের ৭৬ শতাংশই পানি পানের অনুপযোগী বলে জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ পানিতে দুর্গন্ধ এবং ১৭ শতাংশ ভাসমান কণার অভিযোগ করেছেন। নলকূপ ব্যবহারকারীদের ৫৮ শতাংশ পানিতে অস্বাভাবিক বাদামি রঙের কথা জানিয়েছেন। শোধন করে পান করার পরও ওয়াসার পানি ব্যবহারকারীদের ১১ শতাংশ এবং নলকূপের পানি ব্যবহারকারীদের ৯ শতাংশ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন। উভয় উৎসের পানির ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ মানুষ জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন। আক্রান্তদের ৭০ শতাংশের বেশি শিশু।

গবেষকদের মতে, কর্ণফুলী ও হালদা নদী থেকে পানি শোধন করে সরবরাহ করে ওয়াসা। কিন্তু পাইপলাইনের ফুটো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে গ্রাহকপর্যায়ে পৌঁছানোর সময় পানি দূষিত হতে পারে। অন্যদিকে অনিবন্ধিত কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জারের পানি প্রক্রিয়াজাত করার কারণেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

গবেষণা দলের সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শ্যামল কর্মকার বলেন, গবেষণায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিকের উপস্থিতি দেশেই পরীক্ষা করা সম্ভব। এর বাইরে আরও অনেক অজানা অজৈব দূষক রয়েছে, যেগুলো হয়তো শনাক্তই করা যাচ্ছে না। তার মতে, দূষণের উৎস নির্মূল করে ভূগর্ভ ও ভূপৃষ্ঠের পানির উৎসগুলো দূষণমুক্ত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

তবে পানির দূষণের দায় নিতে নারাজ চট্টগ্রাম ওয়াসা। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, ওয়াসার পানিতে কোনো ব্যাকটেরিয়া নেই। প্রতি মাসে ২৪০টি স্পট থেকে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। 

তার দাবি, মূলত গ্রাহকপর্যায়ে গিয়ে পানি দূষিত হচ্ছে। বাসাবাড়ির রিজার্ভার ও পানির ট্যাংক অপরিষ্কার থাকা এবং বিভিন্ন উন্নয়নকাজে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ময়লা পানি ঢুকে দূষিত হতে পারে।