...|...|...

সারাদেশ

কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে উচ্চমূল্যে সার বিক্রি, দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

বলরাম দাশ অনুপম, কক্সবাজার
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:২৬
Shares
কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে উচ্চমূল্যে সার বিক্রি, দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে উচ্চমূল্যে সার বিক্রিতে কৃষকদের দুশ্চিন্তা। ফাইল ছবি

কক্সবাজারের টেকনাফে এক ধরনের সারের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বিসিআইসি ডিলারসহ খুচরা ডিলার পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকরা সারের জন্য আসছেন আর না পেয়ে বাড়ি ফেরত যাচ্ছেন।

এদিকে সার ডিলারের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করা কৃষকদের মাঝে এক ধরনের হতাশা এবং ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কৃষকরা জানায়, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে জমিতে সার প্রয়োগ করতে হয়। উক্ত দুই মাসই সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময়। এই মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ধান যেমন ভালো হবে না তেমনি ফলনও আশানুরূপ হবে না।  

জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে ধানের চারা রোপণের পর থেকে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। মাঝে কয়েকদিন বৃষ্টি থামলেও আগস্ট মাসের পুরো সময়েই টানা বৃষ্টি ছিলো। ওই সময়ে কৃষকদের অনেকে জমিতে সার প্রয়োগ করলেও বৃষ্টির পানিতে অনেকটা ভেসে গেছে। এতে করে সব ধানী জমিতে পুনরায় সার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার কর্তৃক ইউরিয়া সার বস্তা প্রতি ১৩শ ৫০ টাকা, টিএসপি সার ১৩শ ৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০০ টাকা, এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রি করার নির্দেশনা রয়েছে। আর টেকনাফের কোথাও ওই দামে সার বিক্রি হচ্ছে না। 

তাদের অভিযোগ, ইউরিয়া সার বস্তা প্রতি ১৬৫০ টাকা, টিএসপি সার ১৬৫০ টাকা, ডিএপি ১৪৫০ টাকা ও এমওপি সার ১২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্ষেত্রে ভেদে এর চেয়েও আরো বেশী দামে সার বিক্রির অভিযোগ তুলছেন কৃষকদের অনেকে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি অফিসের নির্দেশনার আলোকে ডিলার কর্তৃক বস্তার মুখ কেটে সার বিক্রি করা হচ্ছে। এরপরও বিভিন্নভাবে পাচারকারীদের হাতে সার পৌঁছে যাচ্ছে। এই সার আবার বিচ্ছিন্নভাবে মিয়নামারে পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। 

সম্প্রতি বিজিবি মিয়ানমারে পাচারকালে হাতে পুটলাসহ সার জব্দ করেন। ১০/২০ কেজি পুটলার সার সংগ্রহ করে পাচারকারীরা বস্তায় ভরে তা আবার নিজেরা সেলাই করে পাচার করে দিচ্ছেন। তবে উক্ত ঘটনার পর থেকে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেকটা নড়েচড়ে বসেছেন। ঘটনটির পর সার পাচার ও বিতরণে আরো কঠোর এবং কঠিন হওয়ার পাশাপাশি শক্ত মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

সূত্র মতে, হ্নীলা-হোয়াইক্যংয়ে কিছুটা সারের সংকট থাকলেও উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে কোনো ধরনের সংকট নেই। এদিকে টেকনাফের জন্য ইতোমধ্যে ৭০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ওই সার পাওয়া গেলে সংকট আর থাকবেনা বলে জানা গেছে। 

উপজেলার হ্নীলা পানখালী এলাকার কৃষক খলিল আহমদ জানিয়েছেন, চলতি আমন মৌসুমে ৪৫ কানি জমিতে ধানের চাষ করেছেন। চাষকৃত জমিতে প্রয়োগের জন্য সারের দোকানে দোকানে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ডিলাররা এধরণের সংকট সৃষ্টি করেছেন দাবি করে তিনি সার না পাওয়ায় রীতিমতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। 

হোয়াব্রাং এলাকার কৃষক সরোয়ার আলম জানান, প্রায় ৪ একর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেন। সারের জন্য তিনি শুধু ঘুরছেন আর ঘুরছেন। কিন্তু সার পাচ্ছেন না। 

একই এলাকার কৃষক মোহাম্মদ হোছন জানান, ১০ কানি জমিতে চাষাবাদ করেছি। সারের জন্য ডিলারের কাছে গেছে ১০/১৫ কেজির উপর সার দেয় না। যা খুবই অপ্রতুল। 

লেদা এলাকার কৃষক মোহাম্মদ হোছন জানান, জমিতে এখনো সার প্রয়োগ করতে পারিনি। চিন্তা করছি কী হবে। 

হ্নীলার মরিচ্যাঘোনা এলাকার কৃষক জহির বৈদ্য জানান, ১০ কানি জমিতে চাষাবাদ করে মাত্র ১০ কেজি সার পেয়েছেন বলে চরম দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

ছোট লেচুয়াপ্রাং এলাকার কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, ৫ কানি জমিতে আমনের চারা রোপণ ও দেড় কানি জমিতে ক্ষেত খামারের করেছেন। তিনি এখনো কোনো সার না পেয়ে জমিতে সার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। 

হোয়াইক্যং কম্বনিয়াপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুস শুক্কুর ক্ষোভের সাথে সার না পেয়ে জমি পরিত্যক্ত রাখার কথা জানিয়েছেন। 

ওই এলাকার কৃষানি নুরুন্নাহার জানান, ৩ কানি জমিতে আমন ধান ও ১ কানি জমিতে ক্ষেত খামার করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত কেবল ১৫ কেজি সার পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। রইক্ষ্যং এলাকার কৃষক আব্দু শুক্কুর জানান, ২ একর জমিতে তিনি চাষাবাদ করেছেন। সারের জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তিনি সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগের কথা জানিয়েছেন। 

রইক্ষ্যং পুটিবনিয়া এলাকার কৃষক কিউ চিং চা চাকমা জানান, তিনি এ বছর ৬ কানি জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। সংকটের কারণে জমিতে সার দিতে পারিনি। তিনি বেশ কয়েকবার হ্নীলায় এসেও সার না পেয়ে ফেরত গেছেন। কৃষক কিউ চিং চা চাকমা স্থানীয়ভাবে কেজি প্রতি ৪০/৪৫ টাকায় সার কিনে জমিতে প্রয়োগের কথা জানিয়েছেন। 

কাঞ্জরপাড়া এলাকার কৃষক কামাল উদ্দিন বাচ্চু জানান, ৮ কানি জমিতে ধান লাগিয়ে সারের জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখনো সার পায়নি জানিয়ে তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

লম্বাবিল তেচ্ছিব্রীজ এলাকার কৃষক শাহ আলম জানিয়েছেন, তিনিও এই মৌসুমে ২০ কানি জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। সারের জন্য হোয়াইক্যং ডিলার মোশতাকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি এক কেজিও সার পায়নি বলে জানিয়েছেন। 

সার নিয়ে টেকনাফে কৃষকদের মাঝে এক ধরনের হাহাকার চলছে জানিয়ে বিএনপি নেতা শাহ নেওয়াজ কৃষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, টেকনাফের প্রকৃত কৃষকরা সময়মতো সার পাচ্ছেন না। যাতে সরকারের ভাবমূর্তি বিশেষভাবে ক্ষতি হবে এবং হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হিসেবে টুকটাক সার পাচারের সম্ভাবনা রয়েছে। যা এর আগের সরকারের আমালেও হয়েছে। কৃষি বান্ধব সরকার তারেক রহমানের সরকারের ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন করতে না পারে চোরাকারবারি ও মিয়ানমারে সার পাচারে জড়িতদের চিহ্নিত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। 

টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিসার মো. হুমায়ুন কবির জানান, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রয়ের কোনো সুযোগ নেই। ইতিধ্যে সার ডিলার মালিকদের বৈঠক করে এ বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি উচ্চমুল্যে সার বিক্রি এবং সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলে জানান।  

টেকনাফে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির সভাপতি এস. এম. অনীক চৌধুরী জানান, সার সংকটের বিষয়টি মোটেও সত্য নয়। তবে, হ্নীলা-হোয়াইক্যংসহ টেকনাফ উপজেলায় নতুন করে ১১০হেক্টর লবণ মাঠে ধানের আবাদ বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ৭০মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। যা আগামী সপ্তাহে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাহিদা অনুপাতে সার পেলে আর সমস্যা দেখা দিবে না।