আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও শুল্কের মামলায় আটকে আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা টাকা আদায়। পুরাতন মামলা নিষ্পত্তিতে ধীর গতি বছর বছর নতুন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধিতে তৈরি হয়েছে জট। এতে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখছে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। মামলা জটের ঘেরাটোপে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি, অব্যাহতি ও জালিয়াতি কমিয়ে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।
জানা গেছে, দেশের আদালতে আয়কর, মূসক ও শুল্ক সংক্রান্ত প্রায় ৩২ হাজার মামলা ঝুলে রয়েছে। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। এসব মামলা তিনটি বিভাগের বিভিন্ন কমিশনারেটে অফিস প্রধান ও সমন্বয়কারী কর্মকর্তার নিয়মিত বদলি, বিবাদী পক্ষের ইচ্ছাকৃত অবহেলা, মামলা নিষ্পত্তিতে আদালত-এনবিআরের একটি অসাধু চক্রের ইন্ধন, পুরাতন মামলার সমাধানে উচ্চ আদালতের শৈথল্য এসব মামলার জট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর উপদেষ্টার নেতৃত্বে বকেয়া ও আদালতে ঝুলে থাকা রাজস্ব আদায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে গঠন করে টাস্কফোর্স। এরই ধারাবাহিকতায় রাজস্ব মামলা রায় দ্রুত প্রদান ও আলাদা দৃষ্টি দিতে উচ্চ আদালত কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হয় এনবিআর। আদালত ও এনবিআরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে ও মামলা নিষ্পত্তিতে গতি ফেরাতে এনবিআর গঠন করেছে সমন্বয় কমিটি।
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সদস্য (কর লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মো. আবুল কালাম আজাদ টাইমস টুডেকে বলেন, পুরাতন মামলার নিষ্পত্তিতে ধীরগতি ও নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই জট সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের চাহিদা মোতাবেক যুক্তিযুক্ত তথ্যাদি সরবরাহ ও সমন্বয়হীনতা দূর করতে আলাদা টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জট দূর হবে একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে গতি বৃদ্ধি পাবে।
তথ্যমতে, মোট মামলার পরিমাণ ৩১ হাজার ৭০০টি। জড়িত অর্থের পরিমাণ ৯৯ লাখ ৭০০ কোটি টাকা। কমপক্ষে ৪৭০০ কর সংক্রান্ত মামলার বিপরীতে জড়িত অর্থের পরিমাণ অন্তত ৩৫,৭০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে মূসকের মামলার পরিমাণ ১১ হাজারের বেশি হলেও জড়িত অর্থের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার কোটি টাকার অধিক। শুল্কের মামলার সংখ্যা ১৫ হাজারের অধিক। এর মধ্য শুধু চট্টগ্রামেই ১২ হাজার মামলা চলমান। জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।
জানা যায়, বিচারাধীন রাজস্ব মামলার কারণে আপিল ট্রাইব্যুনাল ও হাইকোর্ট পার হয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এনবিআর ও আদালতের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের যোগসাজসে পেছাতে থাকে মামলার তারিখ। ফলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়ে এবং রাজস্ব আদায়ে গতি কমে যায়। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকার এনবিআরের আয়কর, মূসক ও শুল্ক খাতের জন্য পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করে অর্থ, পরিকল্পনা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নির্দেশনায়।
এই প্রেক্ষিতে, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের দপ্তর থেকে আধা সরকারি পত্র (ডিও) অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের দপ্তরে পাঠানো হয়। পত্রে উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা এসব মামলা দ্রুত কার্যতালিকায় আনতে এবং রাজস্ব আদায়ে গতি সঞ্চারের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার সহযোগিতা কামনা করা হয়। ফলশ্রুতিতে গত ২৩ মে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে দিনব্যাপী বৈঠক করেন এনবিআরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। সেই সভাতেই এনবিআরের কর্মকর্তারা আয়কর, মূসক ও শুল্ক সংক্রান্ত মামলার বাচাইকৃত তালিকা তুলে দেন। সেই তালিকায় ২০০ কোটি থেকে তদুর্ধ্ব সকল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
সূত্র জানায়, গত ১৪ জুন আয়করের পক্ষ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় টিম করে দেওয়া হয়। এনবিআরের সদস্য আবুল কালাম আজাদকে প্রধান করে ১১ সদস্যের সমন্বয় টিমে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের তিনজনসহ ঢাকা ও চট্টগ্রাম কর অঞ্চল থেকে ৫ জন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া সমন্বয় কমিটি আয়কর বিভাগের একজন প্রথম ও একজন দ্বিতীয় সচিবকে হালনাগাদ তথ্যের জন্য যোগাযোগ রাখতেও বলা হয়েছে।
এই সমন্বয় টিম কর অঞ্চলসমূহ ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন ছাড়াও চলমান মামলাসমূহ মামলার কার্যতালিকায় দ্রুত উত্থাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মামলাসমূহের দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে সহায়তা প্রদান এবং এ বিষয়ে কর অঞ্চলসমূহকে অবহিতকরণের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চলমান মামলাসমূহের বিষয়ে কর অঞ্চলের তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ স্থাপন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
এ বিষয়ে এনবিআরের প্রথম সচিব (মূসক বকেয়া ব্যবস্থাপনা ও বিরোধ নিষ্পত্তি) মোহাম্মদ বাপ্পী শাহরিয়ার সিদ্দিকী টাইমস টুডেকে বলেন, সব অঞ্চলেই আদালতের মামলার তদারকির জন্য কমিটি রয়েছে। টাস্কফোর্স গঠনের পর বকেয়া আদায়ে গতি এসেছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা মামলা জট কমাতে সহায়তা করবে।

