টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আগামী ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণা, মাঠ সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষকে সমান সুযোগ দেওয়া এবং কাকরাইল মসজিদ বুঝিয়ে দেওয়াসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের সাদপন্থি অনুসারীরা।
একই সাথে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছে তারা।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শফিক বিন নাঈম।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, তাবলিগ জামাত শত বছরের পুরোনো একটি অহিংস, শান্তিপূর্ণ ও অরাজনৈতিক মেহনত। তবে বাংলাদেশে ২০১৮ সাল থেকে তাবলিগের দুই পক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। সাদপন্থিদের অভিযোগ, জুবায়েরপন্থি হিসেবে পরিচিত একটি পক্ষ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যানারে অপপ্রচার চালিয়ে তাবলিগের পরিবেশ অশান্ত করছে।
সংবাদ সম্মেলনে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দান প্রসঙ্গে সাদপন্থিরা বলেন, ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ইজতেমা ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য টঙ্গীর ১৬০ একর জমি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের অনুমোদন দেন। তাদের দাবি, ময়দানের মালিকানা সরকারের, কোনো পক্ষের ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক মালিকানা নেই। তাই উভয় পক্ষকে সমানভাবে ময়দান ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।
তাদের ভাষ্য, লাখ লাখ দেশি মুসল্লি ও বিপুলসংখ্যক বিদেশি মেহমানের অংশগ্রহণের কারণে টঙ্গী ময়দানের বাইরে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। বিকল্প কোনো স্থানে ইজতেমা আয়োজন করলে বিদেশি মেহমানদের দুর্ভোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে দাবি করেন তারা।
২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বরের সংঘাত প্রসঙ্গে সাদপন্থিরা বলেন, তাদের জোড় কর্মসূচিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তাদের দুই সাথী ইসমাইল মন্ডল ও শামসুদ্দিন বেলাল নিহত হন। এ ঘটনায় তাদের পক্ষের মুরব্বিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও সিআইডি ও পরে পিবিআই তদন্ত করে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে বলে দাবি করেন তারা। তাদের অভিযোগ, এরপরও ওই ঘটনায় তাদের দায়ী করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বরের ঘটনাতেও নিজেদের দায় অস্বীকার করেন সাদপন্থিরা। তাদের দাবি, ১৪ ডিসেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তাবলিগের দুই পক্ষসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে জুবায়েরপন্থিদের ময়দান ছাড়ার বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
তাদের আরও দাবি, ১৫ ডিসেম্বর ময়দান না ছাড়ার পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তির উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর পর ১৮ ডিসেম্বরের ঘটনায় বেলাল হোসেন নিহত হন। সাদপন্থিদের বক্তব্য, নিহত বেলাল হোসেন তাদের অনুসারী ছিলেন। তবে ঘটনার প্রকৃত দায় নির্ধারণে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দায়ী না করার আহ্বান জানানো হয়।
টঙ্গী ময়দানে ভবিষ্যতে ইজতেমা না করার বিষয়ে সাদপন্থিরা কোনো মুচলেকা দিয়েছে-এমন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। তাদের বক্তব্য, ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনের কাছ থেকে ময়দানের মালামাল বুঝে নেওয়ার জন্য তাদের পক্ষ থেকে দুজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা ইজতেমা না করার কোনো মুচলেকা দেননি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া চিঠিতে আগের একটি পত্রে উল্লিখিত শর্তে তারা একমত নয় বলে জানিয়েছিল। পরবর্তী ৯ ফেব্রুয়ারির পত্রে ওই শর্ত উল্লেখ না থাকায় মুচলেকার বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
মাওলানা সাদকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন সাদপন্থিরা। তাদের দাবি, মাওলানা সাদ নিজে নিজে আমির হয়েছেন, আল্লাহ ও নবীর শানে বেয়াদবি করেছেন কিংবা আলেম-ওলামাদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন-এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাকে বাংলাদেশে এনে আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
কাকরাইল মসজিদ প্রসঙ্গে তারা বলেন, ‘তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ’ এর নামে মসজিদটি স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। তাই সেটি তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি দেশের সব মসজিদে কোনো পক্ষকে অন্য পক্ষের দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে বাধা না দেওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশনার দাবি করা হয়।
তাবলিগের দুই পক্ষের বিরোধ নিরসনে উভয় পক্ষকে টঙ্গী ময়দানে নিজ নিজ ইজতেমা করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে সাদপন্থিরা। তাদের দাবি, গত পাঁচ বছর নিজামুদ্দিন অনুসারীরা দ্বিতীয় ধাপে ইজতেমা করায় এবার তাদের প্রথম ধাপে ইজতেমার সুযোগ দেওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলন থেকে জানানো সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে-টঙ্গী ময়দান সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, উভয় পক্ষের জন্য সমতা নিশ্চিত করা, কাকরাইল মসজিদ বুঝিয়ে দেওয়া, দেশের সব মসজিদে বাধাহীনভাবে তাবলিগের কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা, অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং তাবলিগের বিরোধকে কেন্দ্র করে কথিত অপকর্মে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত করা।
এ সময় ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মাওলানা নুরুল ইসলাম, মুফতি ফয়জুর রহমান, মুফতি বোরহান, ড. মো. রেজাউল করিম, তৌহিদুল হক সোহেল, মিডিয়া সমন্বয়ক মোহাম্মদ সায়েম, প্রফেসর মনজুরুল হক, তারেক মাহমুদ, প্রফেসর নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া, প্রফেসর আব্দুল হান্নান ও সাঈদ আহমেদ প্রমুখ।


