...|...|...

সোশ্যাল মিডিয়া

আশির দশকের ট্রেন্ডে মজার ছবি, আড়ালে ব্যক্তিগত তথ্যের ঝুঁকি

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:৫০ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:১৪
Shares
আশির দশকের ট্রেন্ডে মজার ছবি, আড়ালে ব্যক্তিগত তথ্যের ঝুঁকি

ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের প্রায় প্রতিটি স্ক্রলেই এখন চোখে পড়ছে আশির দশকের নস্টালজিয়া। দানাদার ফিল্মের টেক্সচার, ঘন ও ফোলানো চুল, চওড়া কলার, স্পষ্ট ভ্রু আর গম্ভীর অথচ আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে নিজেদের ছবিকে যেন কয়েক দশক পেছনে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবহারকারীরা।

স্টোরি, রিল কিংবা ব্যক্তিগত প্রোফাইলে এমন ছবি শেয়ার করে অনেকেই মেতে উঠেছেন নতুন এই ডিজিটাল ট্রেন্ডে। নিজেরও এমন একটি ছবি বানানোর কাজটিও বেশ সহজ। পছন্দের একটি ছবি চ্যাটজিপিটি বা অন্য কোনো এআই টুলে আপলোড করে একটি নির্দেশনা (প্রম্পট) দিলেই মিনিটখানেকের মধ্যে তৈরি হয়ে যাচ্ছে আশির দশকের আবহে নতুন ছবি।

কিন্তু এই নস্টালজিয়ার আড়ালে রয়েছে ব্যক্তিগত তথ্যের বড় ঝুঁকি। নিজের ছবি এআই টুলে দেওয়ার সময় ব্যবহারকারীরা আসলে শুধু একটি ছবি দিচ্ছেন না; দিচ্ছেন নিজের চেহারা, পারিপার্শ্বিকতা এবং ছবির সাথে থাকা আরও নানা তথ্য। প্রশ্ন হচ্ছে—এই তথ্যগুলো দিয়ে এআই টুল কী করছে, কোথায় রাখছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহার হতে পারে?

একটি ছবিতে শুধু একজন মানুষের অবয়ব থাকে না। এর সাথে যুক্ত থাকে তার বায়োমেট্রিক তথ্যও। চলমান আশির দশকের এআই ট্রেন্ড নিয়ে তুরস্কের টিজিআরটি নিউজে সতর্ক করেছেন ফরেনসিক ইনফরমেটিকস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আলি মুরাত কিরিক।

তিনি বলেন, ছবি আপলোড করার মুহূর্তেই ব্যবহারকারী নিজের মুখসহ ব্যক্তিগত তথ্য একটি ডিজিটাল সেবার হাতে তুলে দেন। মুখের রেখা, চোখ, নাক ও চোয়ালের গড়ন একজন মানুষকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে।

ড. কিরিকের মতে, একই ব্যক্তির বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন কোণ থেকে তোলা একাধিক ছবি কোনো এআই টুলে দেওয়া হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। কারণ এসব ছবি একত্রে ব্যবহারকারীর একটি আরও নিখুঁত ফেসিয়াল প্রোফাইল তৈরি করতে পারে।

আর আশির দশকের এই ট্রেন্ডে ব্যবহারকারীরা সাধারণত একটি ছবিতেই থেমে থাকছেন না। একটি ছবি পছন্দ না হলে আরেকটি, সেটি মনমতো না হলে আরও একটি ছবি দিয়ে চেষ্টা করছেন। ফলে প্রতিটি নতুন ছবিই ওই ডিজিটাল প্রোফাইলে আরও তথ্য যোগ করছে।

এআই টুলে আপলোড করা ছবি শুধু মুখ বিশ্লেষণ করেই থেমে যায় না। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিটডিফেন্ডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছবির পেছনের দৃশ্য, কর্মস্থলের ইঙ্গিত, পোশাক বা ইউনিফর্ম, নথিপত্র, শিশুদের মুখ, ঠিকানা, অবস্থান শনাক্ত করার সূত্র এবং ছবির মেটাডেটাও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে পরিবার বা বন্ধুদের সাথে তোলা ছবি এআইয়ে ব্যবহার করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। কারণ তখন ছবিতে থাকা অন্য ব্যক্তিদেরও তথ্য এআই সেবার কাছে চলে যাচ্ছে—যদিও তারা এ বিষয়ে কোনো সম্মতি দেননি।

ওপেনএআইয়ের প্রাইভেসি পলিসি অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর কনটেন্ট প্রতিষ্ঠানটি সেবা উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে আপলোড করা ফাইল ও ছবিও রয়েছে। অর্থাৎ ভোক্তা বা কনজিউমার অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে এসব তথ্য মডেল প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহারের সুযোগ থাকে।

তবে ব্যবহারকারী চাইলে এ সুবিধা বন্ধ করতে পারেন। এর জন্য চ্যাটজিপিটির সেটিংসে গিয়ে ডেটা কনট্রোলস থেকে সংশ্লিষ্ট অপশন বন্ধ করতে হয়। অন্যদিকে এন্টারপ্রাইজ, টিম ও এপিআইয়ের মতো ব্যবসায়িক সেবায় ডিফল্টভাবে ব্যবহারকারীর তথ্য মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হয় না।

তথ্য মুছে ফেলার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ করা হলে সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে তা সরানো হয়। তবে নিরাপত্তা, প্রতারণা প্রতিরোধ কিংবা আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে কিছু তথ্য আরও দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা হতে পারে।

একইসাথে ওপেনএআইয়ের ব্যবহারনীতিতে সম্মতি ছাড়া ফেসিয়াল রিকগনিশন ডেটাবেজ তৈরি এবং কারও সম্মতি ছাড়া তার চেহারা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে মজিলা ফাউন্ডেশনের ‘প্রাইভেসি নট ইনক্লুডেড’ প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের নীতির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাদের মতে, ব্যবহারকারীরা চ্যাটবটে দেওয়া ছবি বা লেখা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে কিংবা কার হাতে যাচ্ছে—এসব তথ্য সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য সহজে বোঝা কঠিন।

এআই টুলে ছবি দেওয়ার পর তা কোথায় এবং কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে, সেটিও বড় প্রশ্ন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সাইবারনিউজ একটি জনপ্রিয় এআই ছবি ও ভিডিও তৈরির অ্যাপ পরীক্ষা করে এমন একটি ঘটনা সামনে আনে।

গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপটির ডাউনলোড ছিল পাঁচ লাখের বেশি। পরীক্ষায় দেখা যায়, অ্যাপটির ক্লাউড স্টোরেজে কোনো পাসওয়ার্ড বা যাচাই ব্যবস্থা ছিল না। শুধু ঠিকানাটি জানা থাকলেই সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল। ওই স্টোরেজে ব্যবহারকারীদের আপলোড করা ১৫ লাখের বেশি ছবি, প্রায় পৌনে চার লাখ ভিডিওসহ মোট প্রায় ৮২ লাখ ফাইল ছিল। সব মিলিয়ে ডেটার পরিমাণ ছিল ১২ টেরাবাইটেরও বেশি।

অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা যেখানে কেবল একটি মজার ছবি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সেখানে তাদের আপলোড করা তথ্য অন্যদের দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

এআইয়ের অনুমান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ‘ন্যানো বানানা শাড়ি’ ট্রেন্ডের একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়। ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ঝলক ভবানী সবুজ কামিজ পরা একটি ছবি গুগল জেমিনিতে দিয়ে রেট্রো পোর্ট্রেট তৈরি করেন। পরে তৈরি ছবিতে তার বাঁ হাতে একটি তিল দেখা যায়, যা আপলোড করা ছবিতে ছিল না। বাস্তবে তার হাতে তিল থাকলেও এআই ছবিতে সেটি কীভাবে এল—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ঘটনাটি কাকতালীয়ও হতে পারে। তবে এখানেই বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—এআই কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে কী ধরনের অনুমান করছে, তা জানার বা যাচাই করার সুযোগ ব্যবহারকারীর কতটা আছে?

ঝুঁকির আরও ভয়াবহ দিক হলো ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা যৌন ডিপফেক। সিএনবিসি ও টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্টের অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় ৮০ জনের বেশি নারীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য ছবি ব্যবহার করে তাদের অনুমতি ছাড়াই যৌন ডিপফেক তৈরির ঘটনা সামনে আসে।

বাংলাদেশেও এ ধরনের অভিযোগে মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের মে মাসে কুমিল্লার চান্দিনায় এক নারী উদ্যোক্তার এআই দিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে মামলা হয়। পরে এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এআইয়ের এই ট্রেন্ড থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা সবার জন্য হয়তো সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকি কমাতে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

ব্যক্তিগত তথ্য যতটা সম্ভব কম শেয়ার করা, এআই টুলে আসল ও উচ্চমানের ব্যক্তিগত ছবি আপলোড না করা এবং প্রম্পটে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়াই নিরাপদ। পরিবার, বন্ধু বা অন্য কারও ছবি ব্যবহারের আগে তাদের সম্মতিও নেওয়া উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এআই টুলকে ব্যক্তিগত বা বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে না দেখে একটি ডিজিটাল সেবা হিসেবে ব্যবহার করা। এমনভাবে ভাবা উচিত, সেখানে আপলোড করা কোনো তথ্য ভবিষ্যতে অন্য কারও হাতে যেতে পারে।

কারণ আশির দশকের নস্টালজিয়া হয়তো কয়েক মিনিটেই তৈরি করা যায়। কিন্তু একবার নিজের ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি কোথাও ছড়িয়ে গেলে সেটি নিয়ন্ত্রণে ফেরানো অনেক কঠিন।

ফরেনসিক ইনফরমেটিকস বিশেষজ্ঞ আলি মুরাত কিরিকের কথায়, এআই আমাদের দেখাতে পারে আশির দশকে আমরা কেমন দেখতে ছিলাম। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো—আজ যে মুখটি আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে তুলে দিচ্ছি, কাল সেটি কোথায় ব্যবহার হতে পারে।